Showing posts with label HISTORICAL FACTS ABOUT KOLKATA. Show all posts
Showing posts with label HISTORICAL FACTS ABOUT KOLKATA. Show all posts

 


ব্রিটিশদের ব্যবসা চুক্তি এবং জাত ব্যবস্থার বিলোপঃ

কলকাতায় প্রথম এসে ব্যবসা শুরু করেছিলেন সাবর্ণ রায়চৌধুরী এবং জগৎ শেঠ এবং তার পরবর্তীতে অনেক ছোট ব্যবসাদাররা কলকাতায় এসে ব্যবসা শুরু করেন। এবং এই সময় থেকেই কলকাতায় বিদেশী জাতি ব্যাবসা করতে থাকে। এই সম্পর্কে বিস্তারিত ভাবে বলেছি সুতানুটি, গোবিন্দপুর এবং কলিকাতার নামকরণ ও বাণিজ্যের ইতিহাস এই ব্লগে। কিন্তু মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে যে জাত ব্যাবস্থা বলতে কি আমি হিন্দু, মুসলিম, খ্রিষ্টান, বা ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় প্রভৃতি জাতের কথা বলছি? না। আসলে এখানে জাত ব্যাবস্থা হল ব্যবসায়িক জাত ব্যাবস্থা। কে কি ব্যবসা করছে তার ওপর ভিত্তি করে জাত প্রথা এবং সম্পূর্ণটাই মানুষের মন গড়া।

যেমন কলকাতার সনাতন পরিবার বা ব্যবসাদারদের কথা যদি বলতে হয় তাহলে সবার আগেই উঠে আসে সাবর্ণ রায়চৌধুরী এবং জগৎ শেঠ- দের কথা কারণ কলকাতায় বিদেশী ব্যবসাদার আসার আগেথেকে এনারা ব্যবসা করছেন। মূলত সুতোর ব্যবসা ছিল বলে এনাদের বলাহয় তন্তুবায় সম্প্রদায়। আবার বিদেশী ব্যবসাদাররা আসার সাথে সাথে অনেক ব্যাবসাদার রা কলকাতায় চলে আসেন যেমন যারা সোনার ব্যবসা করত তাঁরা পরিচিত হন স্বর্ণ বনিক হিসাবে, কাঁসার ব্যবসা যারা করত তাঁরা কংসবণিক হিসাবে। আবার মাটির মূর্তি গড়ার কাজ যারা করতেন তাঁরা পাল সম্প্রদায় হিসাবে পরিচিত হলেন বাবার তাঁরা যেখানে থাকতেন সেখানকার নাম হল কুমোরটুলি। এরম ভাবে অনেক সম্প্রদায় কলকাতায় এসেছে এবং বিভিন্ন স্থানের নাম হয়েছে যেমন দর্জি পাড়া, আহিরিটোলা প্রভৃতি। সাধারনত স্বর্ণবনিক, কংসবণিক, তন্তুবায় এরা কুমোর, কামার , দর্জি প্রভৃতি সম্প্রদায়কে নিচু চখে দেখত। কিন্তু ইংরেজরা কলকাতায় বাণিজ্য করার অধিকার পাওয়ার পরে প্রথমেই সাবর্ণ রায়চৌধুরী এবং জগৎ শেঠ দের সাথে ব্যবসা চুক্তি করেন শুধু এখানেই থেমে তাকেননি নিজেদের প্রয়োজনে এবং লাভের জন্য পায় সন সম্প্রদায়ের সঙ্গে ব্যবসা চুক্তি করেন এবং দাদন* দেন। এই ঘটনা যে সাবর্ণ রায়চৌধুরী এবং জগৎ শেঠ ভাল ভাবে নেয়নি সেটা আপত্তি জনিয়েই বুজিয়ে দেন শুধু তাই নয় তাঁরা কোম্পানির কাছ থেকে যে দাদন নেবেন না তাও বলেন। ভবিষ্যতে যে বাঙালি নিজেদের কৌলীন্য বৃত্তি হারিয়ে ফেলার যে প্রবনতা দেখতে পেয়েছিল টা এই ঘটনা থেকেই বুজতে পারি।

কোম্পানি কলকাতায় যে সময়ে লাইসেন্সে প্রথা আনে সেই সময় যে বাঙালি কৌলীন্য বৃত্তি হারাচ্ছিল তা বুঝতে পারি কারণ এই এইসময়ে কোম্পানি বিভিন্ন লোককে বিভিন্ন কারবার করার লাইসান্সে দিয়েছিল।প্রথম ১৭৩৮ সালে ইংরাজ কোম্পানি গ্লাস তৈরি, আতশবাজি তৈরি, নারকেল দড়ির কারখানা করার জন্য লাইসেন্সে প্রদান করেছিলেন। আবার ১৭৬৩ খ্রিষ্টাব্দে রামকৃষ্ণ ঘোষ লাইসেন্সে নিয়েছিল আয়নার কারখানার জন্য, মনোহর মুখোপাধ্যায় লাইসেন্সে নিয়েছিল নৌকা ও বোটের কারবারের জন্য, আতসবাজির জন্য লাইসেন্সে নিয়েছিলেন ময়নদ্দি বারুদওয়ালা, সিন্দুর প্রস্তুতির জন্য লাইসেন্সে নিয়েছিলেন নারায়ন সামন্ত, মেটে সিন্দুর এবং হিরাকস প্রস্তুতির জন্য লাইসেন্সে নিয়েছিলেন ফকির চাঁদ দত্ত, গাঁজা ও সিদ্ধির দোকানের জন্য লাইসেন্সে নিয়েছিলেন বাবুরাম ঘোষ।

১৭৬৫ খ্রিষ্টাব্দে যারা লাইসেন্সে নিয়েছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন, আয়নার কারখানার জন্য বাবুরাম ঘোষ,  মেটে সিন্দুর,হিরাক্‌তুতে এবং ফটকিরির -এর জন্য জগন্নাথ হালদার,আতসবাজির জন্য কালিচরন সিংহ, সিদ্ধির দোকানের জন্য  আনন্দরাম বিশ্বাস।

এতক্ষণ যা বললাম তাতে এটা বোঝাগেলো যে অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ এবং উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যে প্রায় সমস্ত রকম বাঙালি সবরকম ব্যবসায় নিজেদের নিয়োজিত করে। এই সময়ের অনেক বাঙালি ইংরেজদের সাথে আমদানি-রপ্তানির ব্যবসা করে বিশেষ ধনপতি হয়েছিলেন। তাদের সকলের কথা প্রায় “কলকাতার বাঙালি বড়লোক” এই সিরিজ-এ বলেছি। তবুও এখানে তাদের নাম গুলো জেনে নেওয়া যাক। তন্তুবায় গোষ্ঠীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন বৈষ্ণবচরন শেঠ, তাম্বুলি গোষ্ঠীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন গোবর্ধন রক্ষিত, সুবর্ণ বনিক সম্প্রদায়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন সুখময় রায়, মথুরামোহন সেন, প্রাণকৃষ্ণ লাহা, লক্ষ্মীকান্ত ধর, মতিলাল শীল, সাগর দত্ত প্রমুখ। কায়স্থ হয়েও যারা ব্যবসাতে অংশগ্রহণ করেছিলে তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন গোকুল দত্ত, মদন দত্ত, রামদুলাল সরকার।চিন্তা নেই ব্রাহ্মণের সাথেও পরিচয় হবে।  

সামনের পর্ব থেকে বিভিন্ন বাঙালির ব্যাবসায়িক কর্মকাণ্ড নিয়ে আলোচনা কর। কথা দিছি ভাল লাগবে। একটু অপেক্ষা করুন।

·        দাদন কি?

দাদন কথাটি এসেছে ফরাসি দাদনি কথা থেকে, যার অর্থ হল অগ্রিম। ইংরেজরা ভারতীয়দের সাথে ব্যবসায়িক চুক্তি করে তাদের অগ্রিম প্রদান প্রথা চালু করেন। একেই বলে দাদন প্রথা। অনেকটা আজকের advance দেওয়ার মতো।


COFFEE HOUSE KOLKATA- কলকাতা কফি হাউস




ফি হাউস, উত্তর কলকাতায় কলেজে পড়েছেন বা উত্তর কলকাতায় চাকরি করেছেন কিন্তু কখনও কফি হাউসে যাননি এমন লোক খুঁজে পাওয়া মুশকিল । কিন্তু সৌভাগ্য বসত আমি কলকাতার কলেজে না পড়ে এবং কলকাতায় চাকরি না করেও অনেকবার কফি হাউস গিয়েছি কারণ আমার প্রিয় যায়গা কলেজস্ট্রীট। আর বিখ্যাত কফি হউস এই কলেজস্ট্রীতেই। কিন্তু আজকে এই বিষয়টা নিয়ে কেন লিখতে বসলাম? আসলে যারা কফি হউস-এ আসেন, সে ভারতীয় হোক বা বিদেশী সকলেই মনে করেন এটাই কলকাতার প্রথম কফি হাউস। কিন্তু আসলে তা নয়। তাই আসুন শুনেনি কফি হাউসের দীর্ঘদিনের পথ চলার কথা।

১৭৬২ সালের ২১শে জুন উইলিয়াম পার্কেস নামে এক সাহেব কোম্পানির কাছে আবেদন করলেন যে তিনি শহরের একটি প্রান্তে বাগান বাড়ি কিনেছেন এবং সেখানে তিনি আমদ প্রমদের জন্য একটি কফি রুম খুলতে চান। প্রস্তাবটি যথেষ্ট উত্তম ছিল কিন্তু ভয় ছিল অন্য যায়গায়। কোম্পানির জোয়ান ছেলে ছোকরা রা যদি আমদ প্রমদের জোয়ারে ভেসে জায় তাহলে কোম্পানির ব্যবসা মাথায় উঠবে। তাই একটি শর্তে অনুমতি পাওয়া যাবে সেটি হল অফিসের টাইম- এ এই কফি রুম বন্ধ রাখতে হবে। এই শর্ত মেনেই কফি রুম চালু হল এবং অচিরেই জনপ্রিয় হয়ে উঠলো।
১৭৮০ সালে কোম্পানির এক ইংরেজ কর্মচারী তার বিবরনে লিখেছেন যে “খাবারের দাম খুব কম, এক ডিশ কফির দাম মাত্র এক সিক্কা টাকা। আর কিছু অতিরিক্ত নেওয়া হয় তার কারণ অন্য।” সেই অন্য কারণ হল যে সেই কফিরুমে থাকতো অঢেল ইংরাজি পেপার এবং বই।

কিন্তু অল্পবয়সীদের এতে মন ভরলনা। তার চাই আর যায়গা এবং আরো ব্যবস্থা। এই আবেদন থেকেই ১৭৮৮ সালে তৈরি হল ক্যলকাটা এক্সচেঞ্জ কফি হাউস, যার বর্তমান নাম রয়েল এক্সচেঞ্জ। এই কফি হাউসে একমাত্র কলকাতার কোম্পানির কর্মচারী, কর্মকর্তা এবং বনিকরাই প্রবেশ করতে পারবে এবং তার জন্য সকলকে সদস্য হতে হবে এবং চাঁদা মাসিক ৪ টকা। এখানে কফি, খাবার, আমদ প্রমদের সাথে মজুত ছিল কলকাতা, লন্ডন এবং মাদ্রাজের সমস্ত ইংরাজি কাগজ এবং রাজনৈতিক খবরের একাধিক পত্রিকা। শুধু গল্প আর খাওয়েই নয় এই কফি হাউসে কফির কাপে চলত চরম বিতর্ক। যে মেজাজ আজও বজায় আছে। কিন্তু সুখের সময়ে হটাত ই খারাপ খাবর ঘনিয়ে এল। একদিন মালিক ঠিক করলেন তিনি এই কফি হাউস বিক্রি করে দেবেন কারণ আড্ডা জমলেও ব্যবসা ঠিক জমছে না তাই বিক্রিয় করাই শ্রেয়। কিন্তু খরিদ্দাররা বেঁকে বসলেন। বিক্রি করা যাবেনা এই কফি হাউস। ঠিক হল কফিহাউস বাঁচাতে লটারি হবে ঠিক হল, টিকিটের দাম থাকবে  ১০০ টাকা এবং ১৬০০০ টিকিট থাকবে,। কিন্তু লটারি করে এই কফি হাউস বাঁচানো গেছিল কিনা জানা যায়নি। কোন নথিতেও উল্লেখ নেই।

ঠিক এই সময়ে লন্ডনে এক প্রকারের কফিহাউস ছিল যার নাম ‘জেরুজালেম কফি হাউস’ ১৮৮৮ সাল অবধি টিকে ছিল এই সংস্থা। কবি কিউপারের পিতৃ নিবাস “কিউপার কোর্ট”-এ ছিল এই কফি হাউস টি। ভারত ফেরত নাবিক, কোম্পানির কর্মকর্তাদের মুল আড্ডা ক্ষেত্র ছিল এই যায়গা। ভারতের গল্প শুনতে অনেক জোয়ান ছেলের সমাগম হত। হিকি ভারতে আসার আগে এখানেই শুনেছিলেন ভারতের কথা।

১৭৯০ সালে জন ম্যাকডোনাল্ড নামে এক ব্যক্তি কলকাতায় পা দিয়েই উপলব্ধি করলেন জেরুজালেমের মাহাত্য। তিনিও একটি বাড়ি কিনলেন ডালহৌসি স্কয়ারে এবং জেরুজালেম কফি হাউসের আদলে তৈরি করলেন একটি কফি হাউস। কফিহাউসটির অবস্থান ছিল বর্তমানে কাউন্সিল হাউস স্ট্রীট যেখানে মিশেছে সেখানে ছিল এই কফি হাউস টি কিন্তু ব্যবসা ঠিক জমেনি। ফলে একদিন লর্ড ডালহৌসি ম্যাকডোনাল্ড-এর কাছ থেকে বাড়িটি ভাড়া নিলেন কারণ সিভিলিয়ানদের জন্য কলেজ তৈরি করবেন। ১৮০০ সালে সেই কফি হাউস উঠে গিয়ে তৈরি হল ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ।

আবার তিন দশক পর ১৮৩৬ সালে কফি হাউস প্রেমীদের জন্য সুখবর এল Alexender’s east india magazine এ খাবর প্রকাশিত হল যে জেরুজালেম কফিহাউসের মত একটি নতুন কফিরুম খুলবে কলকাতায়। সেই সাথে সেখানে বিভিন্ন জায়গার কাগজ, জাহাজ আশা যাওয়ার খাবর এবং লন্ডনের জন্য ডাকের থলি ওখানেই বাধা হবে।
এই রকম সুবিধা যুক্ত হোটেল তখন একটাই ছিল না কলকাতায়। লন্ডন হাউসে তৈরি হল স্পেন্সাস হোটেল যেটি ছিল বর্তমানের হেস্টিংস স্ট্রিট এবং গভরমেন্ট প্লেস ওয়েস্ট এর সংযোগ স্থলে। স্বাধীনতার পর সেটি তৈরি হয় কেন্দ্রীয় সরকারের ট্রেজারি অফিস এবং বর্তমানে সেটি আয়কর দপ্তরের অফিস।

ঠিক একি রকম সুবিধা যুক্ত হোটেল তৈরি হল কলকাতায় যেটির নাম ছিল অকল্যান্ড হোটেল। ১৮৫৮ সালে শুরু হয় এই হোটেল। এখানে ছিল জেরুজালেম কফি রুম, পড়ার আলাদা ঘর, আমোদ-প্রমোদের জন্য আলাদা ঘর এবং কালচারাল অনুস্থানের জন্য আলাদা ঘর। কিছু বছর পর হোটেলের নাম পরিবর্তন হয়ে হল নীল উইলসন হোটেল। যুক্ত হল রাত্রি যাপনের সুবন্দোবস্ত। এরও কিছু বছর পর জেরুজালেম কফি রুমের চাহিদা কমে যাওয়ায় উঠে যায় কফি রুম। এর পর অনেক হাত বদল এবং পরিবর্তনের পর সেই হোটেল আজও টিকে আছে গ্রেট ইস্টান হোটেল নামে।

আর শেষে আসি আজকে যে কফি হাউস দেখেন তার কথায়। এই কফি হাউসটি আজকের যায়গায় প্রথম ত্থেকে ছিলনা। ১৮৬৭ সালের এপ্রিল মাসে কলকাতার  আলবার্ট হল-এ প্রথম কফিহাউস টি প্রতিষ্ঠা হয়। এইসময়ে এতি মুলত ছিল গণ্যমান্য ব্যক্তিদের আড্ডার যায়গা।    ১৯৪২ সালে কফি বোর্ড গঠন হওয়ার পড়ে যৌথ ভাবে এই কফিহউস চলতে থাকে। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পড়ে এই কফিহউসের নাম হয় INDIAN COFFEE HOUSE. ১৯৫৮ সালে কতৃপক্ষ এই কফি হউস বন্ধ করে দিতে চায় কিন্তু কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এর অধ্যাপকদের হস্তক্ষেপে এবং অনুরোধে কফি হাউস আবার নতুন করে বর্তমান যায়গায় চালু হয়। এর পর নানা বাধা বিপত্তি এসেছে কিন্তু কফি হাউস তার অবস্থানেই আছে।

এখনকার যুগের ঝাঁ চকচকে কফি শপের কাছে জৌলুস ফিকে হয়ে গেলেও কফি হাউসের আড্ডা, চাহিদা, আমেজ প্রজন্মের পর প্রজন্ম টিকে থাকবে।  


  

এতদিন ধরে শুধু কে কীভাবে ব্যাবসা করে বড়লোক হয়েছে সেটাই তো শুনিয়ে গেলে ভাই। কেউ কি চাকরি বাকরি করত না?’

জানি আমাকে সামনে পেলে আপনারা এই কথা গুলই আমাক বলতেন। কি করব বলুন তখন বেশিরভাগ লোকে চাষ করত নয়তো ব্যাবসা করত। কিন্তু ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কলকাতায় ঘাটি গেঁড়ে বসার পরে বেশ কিছু চাকরির সৃষ্টি হয়েছিল বটে। আর সেই চাকরি করে বেশ অনেকেই ধনী হয়েছিলেন। তাহলে আসুন আজকে ব্যাবসা ছেড়ে কিছু চাকরিজীবী বিখ্যাত মানুষের কথা শোনা যাক।
সেইসময়ে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মচারী হিসাবে প্রথমেই যার নাম উল্লেখ করতে হয় তিনি হলেন ভেরেলস্ট সাহেবের দেওয়ান ও ঘোষাল বংশের প্রতিষ্ঠাতা গোকুল ঘোষালের পুত্র ভুকৈলাসের মহারাজা জয়নারায়ন ঘোষাল(১৭৫২-১৮২০)। কোম্পানির অধীনে চাকরি করলেও কলকাতার ব্রাহ্মণ সমাজে জয়নারায়ন ঘোষালের প্রতিপত্তি ছিল প্রচুর এবং কলকাতার ব্রাহ্মণরা তাঁকে তাদের কুলপতি বলে মনে করতেন। এই প্রতিপত্তির প্রকাশ পায় কলকাতার অতি ধনী লোক চূড়ামণি দত্তের শ্রাদ্ধের সময়ে। কথিত আছে যে চূড়ামণি দত্তের পুত্র কালিপ্রসাদের একজন যবনী রক্ষিতা ছিল এবং এই যবনী দোষের জন্য শোভাবাজার রাজবাড়ির ব্রাহ্মণ বর্গ সমস্ত ব্রাহ্মণ সমাজকে নির্দেশ দেন যে ‘কোন ব্রাহ্মণ যেন এই শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে যোগদান না করেন’। এর ফলে শ্রাদ্ধ পণ্ড হয়ে যেতে বসলে কালিপ্রসাদের অনুরোধে জয়নারায়ন ঘোষাল সকল ব্রাহ্মনকে যোগদান করেত বলেন।

কিন্তু এই ঘটনা নিয়ে মতবিরোধ আছে একদল ঐতিহাসিক মনে করেন যে বড়িশার সাবর্ণ রায়চৌধুরির পরিবার এবং সন্তোষ রায়ের মধ্যস্থতায় ব্রাহ্মণরা শ্রাদ্ধে যোগদান করেন কিন্তু কোন দক্ষিণা তাঁরা গ্রহন করেননি। ব্রাহ্মণদের দক্ষিণা বাবদ ২০০০০ টাকা কালিপ্রসাদ দত্ত সন্তোষ রায়ের হাতে তুলে দান যা দিয়েই পরবর্তীতে কালীঘাটের বর্তমান মন্দির তৈরি হয়।

এছাড়াও জয়নারায়ন ঘোষাল কলকাতার শিক্ষা ব্যাবস্থা বিকাশে বিশেষ স্মরণীয় হয়ে আছেন। ১৮১৫ খ্রিষ্টাব্দে তিনি নিজ বাসভবনে একটি ইংরাজি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। এবং তাকেই দেশের ইংরাজি শিক্ষার অন্যতম পথিকৃৎ বলাহয়। তিনি নিজে অনেক বাংলা এবং সংস্কৃত সাহিত্য রচনা করেছিলেন এবং কাশির রাজাকে মহাভারতের হিন্দি অনুবাদে সাহজ্য করেছিলেন।

ভুকৈলাসের মহারাজা জয়নারায়ন ঘোষাল-এর পর যার কথা আসে তিনি হলেন বাগবাজারের দুর্গাচরন মুখোপাধ্যায় যার নামে দুর্গাচরন মুখোপাধ্যায় স্ট্রীটের নামকরন হয়েছে। দুর্গাচরন মুখোপাধ্যায় একসাথে তিন মানুষের দেওয়ানি করেছেন। রাজশাহির কালেক্টর রুশ সাহেব, মিন্টমাস্টার হ্যারিস সাহেব, এবং আফিমের এজেন্ট হ্যারিসন সাহেব। ফলে বোঝাই যাচ্ছে যে তিনজনের দেওয়ানি করে মুখার্জি মহাশয় বেশ অনেক পরিমাণই অর্থ উপার্জন করেছিলেন। পংক্ষির আড্ডার নাম শুনেছেন? এই পংক্ষির আড্ডা আসলে গাঁজা খাবার আড্ডা। এই আড্ডার প্রচলন দুর্গাচরন মুখোপাধ্যায় মুখোপাধ্যায় করেছিলেন বলে মনে করাহয় কিন্তু অনেকে আবার বলেন এই আড্ডা দুর্গাচরন মুখোপাধ্যায়-এর ছেলে শিবচন্দ্র শুরু করেছিলেন। কিন্তু এখানে বলে রাখি “রসগোল্লা” সিনেমায় যে রূপচাঁদ পংক্ষির দলের কথা শুনেছেন না? ওটার সাথে এটাকে গোলাবেননা। রূপচাঁদ পংক্ষির দল গানের দল। আর দশটা লোক যেটা করে আপনি কেন সেটা করবেন?

এর পর যার কথা বলতে হয় তিনি হলেন দেওয়ান হরি ঘোষ। “হরি ঘোষের গোয়াল” প্রবাদটা শুনেছেন তো? দুই হরি ঘোষ কিন্তু একই।তৎকালীন সময়ে ইংরাজি এবং ফারসী ভাষা লিখতে এবং বলতে জানতেন বলে তাঁর কদর এবং বেতন দুটোই বেশ বেশি ছিল। তিনি তাঁর কর্ম জীবন শুরু অতিবাহিত করেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মুঙ্গের দুর্গের দেওয়ান হিসাবে। দেওয়ানী থেকে অবসর গ্রহন করার পর তিনি কলকাতায় এসে নিজের বসতবাড়ি প্রস্তুত করেন। কলকাতার বাইরে থেকে কলকাতায় পড়তে আসা অনেক ছাত্র তাঁর বাড়িতে থাকা এবং খাওয়ার সুবিধা পেত। কিন্তু হঠাৎ “হরি ঘোষের গোয়াল” এই কথাটা এল কেন? আসলে হরি ঘোষের বাড়িতে বড় একটি বৈঠক খানা ছিল আর তাতে তজ খোশ গল্পের আসর বসত। অনেক নিষ্কর্মা লোক এই বৈঠক খানাতে এসে গল্পে মজে থাকত তাই এই নামের উদ্ভব। বর্তমান গ্রে স্ট্রীট থকে বীডন স্ট্রীট পর্যন্ত রাস্তা তাঁর নামেই নামাঙ্কিত,’হরি ঘোষ স্ট্রীট।’

তৎকালীন কলকাতায় আরও বেশ কয়েকজন দেওয়ানী করে প্রভূত অর্থ উপার্জন করেছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন

শান্তিরাম সিংহ, যিনি জোড়াসাঁকো সিংহ পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা।

রামহরি বিশ্বাস যিনি নিমক মহলের এজেন্ট  হ্যারিস সাহেবের দেওয়ান।

রামসুন্দর বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন পাটনার আফিমের এজেন্টের দেওয়ান।

কৃষ্ণরাম বসু ছিলেন কোম্পানির হুগলী জেলার মূল লবন এজেন্টের দেওয়ান এবং শ্যামবাজারের বসু পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর নামেই নামাঙ্কিত শ্যামবাজারের কৃষ্ণরাম বসু স্ট্রীট। তাঁর পৌত্র নবীনচন্দ্র বসুর বাসগৃহ ছিল বর্তমান শ্যামবাজার ত্রাম ডিপোর জমিতে। এই নবীনচন্দ্র বসু তাঁর গৃহপ্রাঙ্গনে প্রথম প্রথম নাট্যশালা স্থাপন করেন এবং ১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দে ৬ই সেপ্টেম্বর তাঁর বাড়িতেই “বিদ্যাসুন্দর” অভিনীত হয়। ট্রাম ডিপোর পিছনে যে শিব মন্দিরটি আছে সেটি নবীনচন্দ্র বসুরই তৈরি।

আরও একজন দেওয়ান যিনি বাংলার ইতিহাসে স্মরনিয় হয়ে আছেন তিনি হলেন দেওয়ান বৈদ্যনাথ মুখোপাধ্যায়। তৎকালীন সময়ে কলকাতায় ব্রিটিশ আমলাদের মধ্যে তাঁর যথেষ্ট প্রভাব ছিল। এদেশের জনসাধারণের মধ্যে ইংরাজি শিক্ষার একজন অন্যতম পথিকৃৎ। হিন্দু কলেজের প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে তিনিও একজন অন্যতম সদস্য। 
  
এইখানেই শেষ হল এই ‘পুরনো কলকাতার বাঙালি বড়লোক’ সিরিজ। আসব খুব তাড়াতাড়ি ‘পুরনো কলকাতার ব্যাবসা-বাণিজ্য’ সিরিজ নিয়ে।  

বাঙালি ব্যাবসায়ী- বৌবাজারের নামকরণ এবং অন্যান্য:



এতগুলো পর্বে তো অনেক ব্যাবসায়ীর কথা শুনলেন কিন্তু বলতে খারাপ লাগলেও এনারা সকলেই ইংরেজদের সাথে ষড়যন্ত্র করে বা ইংরাজদের পিছনে তেল দিয়েই ব্যাবসা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বা বড়লোক হয়েছিলেন। কিন্তু সমসাময়িক সময়ে অনেকই ছিলেন যারা নিজেদের পরিশ্রম এবং চেষ্টায় নিজেদের ধনী হয়েছিলেন। তবে শুধু ব্যাবসা করে নয় অনেকে বেনিয়ানি(দালালি) করেও বড়লোক হয়েছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় এনাদের সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায় না। কিন্তু আসুন জেনেনি যেটুকু ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়।

প্রথমেই আসি রামচন্দ্র মিত্রের কথায়, তিনি কলকাতার একজন বিখ্যাত বেনিয়ান ছিলেন এবং কলকাতা বন্দরে আসা জাহাজের ক্যাপ্টেনদের বেনিয়েনি করে তিনি বেশ ধনী হয়েছিলেন।

এরপর সেসময়ের শ্রেষ্ঠ ধনী বলা হত গঙ্গারাম সরকারকে। প্রথম জীবনে তিনি পামার কোম্পানির খাজাঞ্চি হিসাবে কর্মজীবন শুরু করেন এবং পরবর্তীতে নিজের স্বাধীন ব্যাবসা শুরু করেন এবং তিনি এত অর্থ উপার্জন করেছিলেন যে সেই সময়ে তাঁকে কলকাতার শ্রেষ্ঠ ধনীদের অন্যতম বলা হত।

বৌবাজারের মালিকঃ

সোজা ভাবে বলতে গেলে বউবাজারের মালিক বিশ্বনাথ মতিলালের পুত্রবধু। আসুন তাহলে পুরো কথাটা খুলে বলি। বিশ্বনাথ মতিলাল ছিলেন দুর্গাচরন পিতুরির ভাগ্নে। আর এই দুর্গাচরন পিতুরি ছিলেন বর্তমান বৌবাজার অঞ্চলের বেশ কয়েকটি বাজারের মালিক। বিশ্বনাথ মতিলাল মামার সম্পত্তির কিছু অংশ পান এবং তাতে বেশ কয়েকটি বাজার পান। বিশ্বনাথ মতিলাল প্রথম জীবনে মাসিক আট টাকা বেতনে একটি লবনের গোলায় চাকরি পান। কিছুকাল পড়ে ম্যাকিনটন এন্ড কোম্পানি ও ক্রুটেনডেন এন্ড কোম্পানির সাথে জড়িত হয়ে স্বাধীন ভাবে ব্যাবসা শুরু করেন। বিশ্বনাথ মতিলাল তাঁর মৃত্যু কালে ১৫ লক্ষ টাকার সম্পত্তি এবং বাজার গুলি রেখে যান। যার মধ্যে একটি বাজারের মালিকানা তাঁর বধুমাতা লাভ করেন। সেই থকে একমাত্র সেই বাজারটির নাম হয় বৌবাজার। ক্রমে অবশ্য পুরো অঞ্চলের নামই হয়ে যায় বৌবাজার।

মদনমোহন দত্ত এবং হাটখোলা রাজবাড়িঃ

অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষের দিকের একজন বিখ্যাত ব্যাবসায়ি ছিলেন মদনমোহন দত্ত। তাঁর প্রপিতামহ গোবিন্দশরন দত্ত আন্দুল থেকে গোবিন্দপুরে এসে বসতি স্থাপন করেন। এই গোবিন্দশরন দত্ত-এর পৌত্র রামচন্দ্র হাটখোলায় উঠে আসেন এবং হাটখোলার দত্ত পরিবারের প্রতিষ্ঠা করেন। এই রামচন্দ্র দত্তের জ্যেষ্ঠ পুত্র হলেন মদনমোহন দত্ত।
এই মদনমোহন দত্ত নিজে স্বাধীন ব্যাবসা করে প্রচুর অর্থের মালিক হন। এই মদনমোহন দত্তের অধীনে রামদুলাল সরকার এবং তাঁর মাতামহী নিরাশ্রয় হিসাবে আশ্রয় লাভ করেন এবং রামদুলাল সরকার মদনমোহনের সরকার বা ম্যানেজার নিযুক্ত হন। রামদুলাল সরকার একবার এক ডুবন্ত জাহাজ থেকে একলক্ষ টাকা লাভ করেন কিন্তু সেই টাকা নিজে না নিয়ে মদনমোহন দত্তকে দিয়ে দেন। রামদুলাল সরকারের এই সততায় খুশি হয়ে এই একলক্ষ টাকা রামদুলাল সরকারকে মদনমোহন দত্ত দান করেন।

এই একলক্ষ টাকা নিয়ে রামদুলাল সরকার স্বাধীন ব্যাবসা শুরু করেন এবং তাঁর হাত ধরেই বাংলার সাথে আমেরিকার বর্হিবানিজ্যের সূত্রপাত ঘটে। কলকাতার বনিক মহলে তাঁর বিশেষ খ্যাতি হয় এবং মাতৃ শ্রাদ্ধে তিনি কয়েক লক্ষ টাকা ব্যায় করেন। রামদুলাল সরকারের দুই ছেলে উনবিংশ শতাব্দির কলকাতার সমাজে ছাতুবাবু এবং লাটুবাবু নামে পরিচিত ছিলেন।

মদনমোহন দত্ত হাটখোলার পুরনো বাড়িতেই ছিলেন কিন্তু তাঁর খুড়তুত ভাই জগৎরাম দত্ত ১৭৯৪ খ্রিষ্টাব্দে নিমতলা ঘাট স্ট্রিটে নতুন বাড়ি তৈরি করেছিলেন।জগৎরাম দত্ত-এর বংশধরেরা আজও নিমতলার বাড়িতে বসবাস করেন। মদনমোহনের পুত্র রামতনু দত্ত তৎকালীন কলকাতার আটবাবুর ১বাবু ছিলেন এবং গঙ্গার ঘাটে তিনি একটি ঘাটও তৈরি করে দিয়েছিলেন।

সৎ ব্যাবসায়ি বৈষ্ণবচরন শেঠঃ

অষ্টাদশ শতকে বড়বাজারের সবথেকে সৎ ব্যাবসায়ি হিসাবে বৈষ্ণবচরন শেঠকেই বিবেচনা করাহয়। তিনি ছিলেন জনার্দন শেঠের পুত্র। এই বৈষ্ণবচরন শেঠকে নিয়ে অনেক মত প্রচলিত আছে। যেমনঃ
একবার তাঁর অংশিদার গৌরী সেন কিছু দস্তা কেনেন কিন্তু পরে গৌরি সেন লক্ষ করেন সেই দস্তার মধ্যে কিছু পরিমান রূপো মিশ্রিত আছে। কিন্তু বৈষ্ণবচরন এটাকে তাঁর অংশীদারেরে অদৃষ্টের লিখন মনে করেন এবং রুপোর লভ্যাংশ নিতে অস্বীকার করেন যা তাঁর অংশীদারকে রাতারাতি ধনী হতে সাহায্য করে।

আবার আরেকটি মত অনুসারে বৈষ্ণবচরন শেঠ ছিলেন পর্তুগীজ আমলের লোক এবং পর্তুগীজ নির্মিত বান্ডেল চার্চ দেখে তাঁর অনুরূপ হিন্দু মন্দির করার বাসনা জাগে। এবং সেই সময়ে ভৈরবচন্দ্র দত্ত নামে একজন তাঁকে নৌকা সহযোগে কিছু দস্তা পাঠাচ্ছিলেন এবং সেই দস্তা রূপোতে রূপান্তরিত হয়ে গেছে বলে তিনি স্বপ্নে আদেশ পান। সেই দৈব লব্ধ অর্থদ্বারাই হুগলীতে ‘গৌরীশঙ্কর মন্দির’ নির্মাণ করাহয়।
আরও একটি ঘটনার কথা প্রচলিত আছে তাহল, বৈষ্ণবচরন শেঠ একবার বর্ধমানের গোবর্ধন রক্ষিতের কাছ থেকে ১০০০০ মন চিনি কেনার চুক্তি করেন। কিন্তু চিনি কদমতলার ঘাটে এসে পৌঁছালে বৈষ্ণবচরন শেঠের কর্মচারীরা গোবর্ধন রক্ষিতের কাজথেকে উৎকোচ আদায় করতে না পেরে চিনি নিম্নমানের বলে প্রচার করেন। এই ঘটনায় ক্ষিপ্ত গোবর্ধন রক্ষিত চিনি নদীর জলে ফেলে দেওয়ার নির্দেশ দেন। সমস্ত ঘটনা বৈষ্ণবচরন শেঠের কানে গেলে তিনি অবশিষ্ট চিনি কিনে নেন এবং ক্ষতিপূরণ বাবদ গোবর্ধন রক্ষিত-কে সম্পূর্ণ চিনির দাম মিটিয়ে দেন।

এরম সততা এরপরে কলকাতার ব্যাবসায়ি মহলে আর দেখা গেছে বলে আবার ব্যক্তিগিত ভাবে মনে হয়না।

অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষের ও উনবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে কলকাতার কয়েকজন সম্ভ্রন্ত লোকের নাম উল্লেখ করে, এই ব্লগ শেষ করব যথাঃ রামরত্ন মল্লিক, রূপচরণ রায়, রামগোপাল মল্লিক, রাধামোহন পাইন, রসময় দত্ত, বিশ্বম্ভর সেন, মধুমাহন সেন, সীতারাম ঘোষ, নিমাইচাদ দত্ত, রামমোহন রায়, গোপীমোহন দেব, রঘুরাম গোস্বামী, গঙ্গানারায়ণ দাস, গদাধর আচার্য, চন্দ্রকুমার ঠাকুর, মহারাজ গুরুদাস রায়, নবকিশোর মিত্র, মহারাজ রাজকৃষ্ণ বাহাদুর, লক্ষ্মীকান্ত ধর, হরিমোহন ঠাকুর, মহারাজ রামচন্দ্র রায়, লাডলিমোহন ঠাকুর, কাশীনাথ মল্লিক, রূপলাল মল্লিক, রূপচাদ রায়, রাজনারায়ণ সেন, গুরুপ্রসাদ বস্তু, কাশীনাথ ঘোষাল, নবকুমার ঠাকুর, দ্বারকানাথ ঠাকুর, রাধামাধৰ বন্দ্যোপাধ্যায়, কালীপ্রসাদ ঠাকুর, কাশীকান্ত ঘোষাল, হেরম্ব মিত্র, শিৰকৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায়, মতিলাল শীল, তারাকৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায়, রামতনু বন্দ্যোপাধ্যায়, তারাকিঙ্কর চট্টোপাধ্যায়, কালীশঙ্কর চট্টোপাধ্যায়, রাজনারায়ণ মুখোপাধ্যায়, রামকান্ত চক্রবর্তী, তারাপ্রসাদ ন্যায়ভূষণ, কবিচন্দ্র তর্কচূড়ামণি, গৌরমোহন বিদ্যালঙ্কার, রামকমল সেন, গোপীকৃষ্ণ দেব, রাধাকান্ত দেব, সীতানাথ বসু, জয়নারায়ণ মুখোপাধ্যায়, কালীশঙ্কর ঘোষাল, উমানন্দ ঠাকুর, কালীকুমার ঠাকুর, প্রসন্নকুমার ঠাকুর, গৌরীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়, শম্ভুচরন বন্দ্যোপাধ্যায়, নীলরত্ন হালদার, কাশীনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, দুর্গাচরণ চক্রবর্তী, চৈতন্যচরণ শেঠ, প্রাণকৃষ্ণ শেঠ, রামগোপাল মল্লিক, রঘুনাথ চন্দ্র, কৃষ্ণমোহন দত্ত, গোলকচন্দ্র দাস, চন্দ্রশেখর দাস, তারিণীচরণ মিত্র, মদনমোহন বসু, ভুবনমোহন দেব, মহেন্দ্র নারায়ণ দেব, ভগবতীচরণ মিত্র, রাধাকৃষ্ণ মিত্র, জগমোহন বস্তু, রামকৃষ্ণ দে, তারাচাদ বসু, চন্দ্রশেখর মিত্র, ঈশ্বরচন্দ্র মিত্র, বিশ্বনাথ রায়, লক্ষ্মীনারায়ণ দত্ত, ভোলানাথ মিত্র, রামচন্দ্র ঘোষ, নীলকমল মজুমদার, বৈষ্ণবদাস মল্লিক, কৃষ্ণচন্দ্র রায়, রাজনারায়ণ সেন, স্বরূপচন্দ্র সেন, মদনমোহন মল্লিক, হলধর দে, প্রাণভূষণ দাস, নবকৃষ্ণ সিংহ, নীলমণি দত্ত, প্রাণকৃষ্ণ বিশ্বাস, রামচন্দ্র বিশ্বাস, নীলমণি দে, রসিকচন্দ্র নিয়োগী প্রমুখ

ছোট্ট গল্প সেইসব মানুষদের নিয়ে যাদের আমরা ভুলে গেছি কিন্তু তারা ইতিহাসে খুব গুরুত্বপূর্ণ: 



হ্যাঁ সত্যিই ছোট্ট কিছু গল্পই আজকে বলবো। আসলে আজকে যাদের কথা বলবো তাদের সম্পর্কে বিশেষ কিছু তথ্য ঐতিহাসিকরা পাননি ফলে আগের পর্ব গুলোর মতো আকর্ষণীয় কিছু এই পর্বে বলার নেই। প্রথমে ভেবেছিলাম বলবনা কিন্তু ইতিহাস যখন বলতে বসেছি তখন বাদ দিয়ে যাওয়াটা অন্যায় হবে। আরকি, নিরস গল্পই শুনুন তবে।

আগের পর্বে যে বলেছিলাম যে পলাশীর যুদ্ধের পরে হটাৎ করে অনেকেই বড়লোক হয়ে গিয়েছিল। সেই কয়েকজন বড়লোকের মধ্যে একজন বিশেষ জনপ্রিয় ছিলেন সে হলেন মহারাজা রাজবল্লভ(১৬৯৮-১৭৬৩)। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রথম রাজস্ব বন্দোবস্তের সময়ে রাজবল্লভ লর্ড ক্লাইভ কে সাহায্য করেছিলেন বলে প্রমান পাওয়া যায় অনেক নথিতে। পলাশীর যুদ্ধের পর রাজবল্লভ কলকাতায় চলে আসেন এবং সুতানুটির অন্তর্গত বাগবাজারে এসে বসবাস শুরু করেন। আজকের যে রাজবল্লভ পাড়ার নাম শুনি সেটা এনার নাম থেকেই আগত। কথিত আছে যে মহারাজা রাজবল্লভের বাড়ির সামনের রাস্তাই রাজবল্লভ পাড়া নামে পরিচিতি।

কিন্তু এই মহারাজা রাজবল্লভ কে ছিলেন? বা ওনার পদবী কী ছিল? সেই নিয়ে নানা গবেষক নানা কথা বলেছেন। যেমনঃ
কালীপ্রসন্ন বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর “বাংলার ইতিহাস” গ্রন্থে রাজবল্লভকে বৈদ্য বলে বর্ণনা করেছেন। যা আবার তৎকালীন কলকাতার জনশ্রুতির সাথেও মিলে যায়।

শ্রী তপনমোহন চট্টোপাধ্যায়ের মতে মহারাজ রাজবল্লভের পদবী ছিল “সেনগুপ্ত”।
আবার শ্রী রাধারমণ মিত্র বলেন রাজবল্লভের পদবী ছিল “সোম”।

কিন্তু মজার ব্যাপার এই হল যে রাজবল্লভের বংশধরেরা কোনোদিন সেনগুপ্ত বা সোম পদবী ব্যাবহার করেনি। তাদের ব্যাবহৃত পদবী ছিল রায়। ফলে এই বিতর্কের মীমাংসা হয়নি।

মহারাজা রাজবল্লভের অধীনে একজন সরকারী দেওয়ান ছিলেন। তিনি হলেন পাইকপাড়া রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা দেওয়ান গঙ্গাগোবিন্দ সিংহ। তিনি হেস্টিংসের গুপ্ত চক্রান্ত সমুহের সহায়ক। ১৭৭৪ খ্রিষ্টাব্দে হেস্টিংস তাঁকে কলকাতার দেওয়ান পদে নিযুক্ত করেন। যখন পাঁচশালা বন্দোবস্ত হয় তখন গঙ্গাগোবিন্দ সিংহ নাটোর রাজবাড়ির কিছু অংশ কিনে নেন এবং দিনাজপুর জমিদারির বেশ কিছু অংশ কিনে নেন। নিজের ধনসম্পত্তির প্রভাব দেখাতে তিনি মাতৃ শ্রাদ্ধে প্রচুর অর্থ ব্যায় করেন। পরম বৈষ্ণব লালাবাবু(কৃষ্ণচন্দ্র সিংহ ১৭৭৬-১৮২২) ছিলেন তাঁর পৌত্র।

শুধু এখানেই শেষ নয়। হেস্টিংসের কৃপায় আরও একজন বিশাল ধনী ব্যাক্তিতে পরিনত হয়েছিলেন তিনি হলেন কাশিমবাজার রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা কান্তবাবু হরফে কৃষ্ণকান্ত নন্দী। প্রথম জীবনে মুদির দোকানে কাজ শুরু করেন কিন্তু ফারসি এবং কাজ চালানর মতো ইংরাজি জানতেন। সেই সুবাদে কাজ পান ইংরাজ কুঠিতে মুহুরি হিসাবে। ইংরাজ কুঠিতে কাজ করের সময়েই চোখে পরেন ওয়ারেন হেস্টিংসের যদিও হেস্টিংস তখন কোম্পানির একজন কর্মচারী মাত্র। পলাশীর যুদ্ধের সময়ে সিরাজের ভয়ে ভীত হেস্টিংস্ কে পালিয়ে যেতে সাহায্য করেন কান্তবাবু। এরপর হেস্টিংসের সাথে ব্যাবস্যা শুরু করেন এবং প্রায় সব রকম অপকর্মের সঙ্গী হন। ১৭৭২ সালে হেস্টিংস গভর্নর হলে উপহার স্বরূপ প্রচুর জমিদারী পান কান্তবাবু। কাশীর রাজা চৈৎ সিং এর ওপর আক্রমণের মূল ষড়যন্ত্রকারী ছিলেন এই কান্তবাবু হরফে কৃষ্ণকান্ত নন্দী। এই কাজের উপহার স্বরূপ লুণ্ঠিত সম্পত্তির বেশ বড় অংশ নিজের ভাগে পান।

এই সময়ে অর্থাৎ অষ্টাদশ শতাব্দীতে কলকাতায় একজন ব্যাক্তি বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছিলেন তিনি হলেন নন্দরাম সেনের পুত্র গৌরী সেন হরফে গৌরীশঙ্কর সেন। ১৭২৩ খ্রিষ্টাব্দে হুগলী জেলা থেকে কলকাতায় এসে ব্যবসা শুরু করেন নন্দরাম সেন। গৌরী সেন সেই ব্যাবসাকেই এগিয়ে নিয়ে যান এবং ইংরেজদের সাথে আমদানি এবং রপ্তানির ব্যাবসা শুরু করেন ও প্রভূত অর্থ উপার্জন করে কলকাতার খ্যাতনামা ধনী ব্যাক্তিতে পরিনত হন। কিন্তু তিনি ব্যাবসার জন্য খ্যাত হননি। তিনি খ্যাত ছিলেন্ দানের জন্য। অনেক দেনাগ্রস্ত এবং রাজদ্বারে দণ্ডিত ব্যাক্তিদের তিনি অর্থ সাহায্য করেছিলেন। সেই সময়ের একটি প্রবাদ সৃষ্টি হয়ে গিয়েছিল- “লাগে টাকা দেবে গৌরী সেন”। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই পরিবার সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায়নি। হতে পারে আমার জানা নেই।

আজকের নিরস গল্প এখানেই শেষ করি সামনের দিন আবার বলবো সেইসব বাঙালিদের কথা যারা সেই সময়ে ব্যাবসা করে বড়লোক হয়েছিল।   

শোভাবাজার রাজবাড়ি এবং নবকৃষ্ণ দেব: 





কলকাতার বাঙালি বড়লোকদের মধ্যে অনেকেই কিন্তু আকস্মিক ভাবে বড়লোক হয়েছেন। সেই রকমই পলাশীর যুদ্ধের পর যারা আকস্মিক ভাবে বড়লোক হয়েছিলেন তাদের মধ্যে শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রতিষ্ঠাতা নবকৃষ্ণ দেব অন্যতম।

নবকৃষ্ণ দেব হলেন রামচরনের পুত্র। রামচরন প্রথম জীবনে কটকের দ্দেওয়ান ছিলেন এবং পরবর্তী জীবনে তিনি গোবিন্দপুরে এসে বসবাস শুরু করেন। কিন্তু আকস্মিক ভাবে তাঁর মৃত্যু হয়। পিতার মৃত্যুর পর নবকৃষ্ণ দেব তাঁর মায়ের তত্ত্বাবধানে উর্দু, ফারসী, আরবি এবং ইংরাজি শিখতে থাকেন এবং একসময়ে এই সব ভাষা লিখতে এবং পড়তে পটু হয়ে ওঠেন।

নবকৃষ্ণ দেব তাঁর প্রথম কর্ম জীবন শুরু করেন পোস্তার রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা লক্ষ্মীকান্ত ধরের ব্যাবসার মুহুরি হিসাবে, কথিত আছে যে নবকৃষ্ণ দেব ঠিক এই কারনেই পোস্তা রাজবাড়িতে জুতো
 পড়ে ঢুকতেন না। এই লক্ষ্মীকান্ত ধরের চেষ্টায় ১৭৫০ খ্রিষ্টাব্দে নবকৃষ্ণ দেব লর্ড ক্লাইভের ফারসী ভাষার মুন্সী নিযুক্ত হন এবং সিরাজ উদ দৌল্লাকে নবাবের আসন থেকে সরাতে যে লেখা-পড়া হয়েছিল কোম্পানির তরফ থেকে তাঁর পুরোটাই করেন নবকৃষ্ণ দেব। ফলস্বরূপ সিরেজের গুপ্তধন থেকে কোটি কোটি টাকা লাভ করেন এবং কলকাতায় প্রতিষ্ঠা করেন শোভাবাজার রাজবাড়ি এবং শুরু করেন কলকাতার প্রথম দুর্গা পূজা। ১৭৬৫ খ্রিষ্টাব্দে নবকৃষ্ণ দেবকে ‘রাজা বাহাদুর’ উপাধি দেন মোঘল সম্রাট শাহ্‌ আলম। ১৭৭৮ খ্রিষ্টাব্দে সুতানুটির তালুকদারি লাভ করেন এবং গভর্নর হেনরি ভ্যান্সিটার্ট-এর বেনিয়ান হন এবং পরবর্তীতে ওয়ারেন হেস্টিংসের বেনিয়ান হন।  

এবার একটু অন্য কথা বলি। ধরুন আপনি চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউ ধরে অরবিন্দ সরণির দিকে এগিয়ে চলেছেন হঠাৎ দেখবেন রাস্তার মাঝখানে একটি কালী মন্দির(আটচালা শৈলীর পুটিয়া কালী মন্দির)। এই কালী মন্দির থেকে ডানদিকে একটি রাস্তা চলে যাচ্ছে সেটি হল নবকৃষ্ণ দেব স্ট্রীট। এই রাস্তা ধরে প্রায় ১০০মি. গেলেই চোখে পড়বে রাজবাড়ি। কিন্তু যারা গেছেন তাদের মনে প্রশ্নও আসবে যে রাজবাড়ি তো দুটো ? তাহলে অপরটি কি আলাদা? এই উত্তরটাই দেব এখন।

আসলে রাস্তার দক্ষিণ পাশে যে বাড়িটি আছে সেটিও শোভাবাজার রাজবাড়ির একটি অংশ। নবকৃষ্ণ দেব যখন সম্পত্তি উইল করেন তখন তাঁর কোন পুত্র সন্তান ছিলনা ফলে তিনি তাঁর ভাইপো গোপীমোহন কে দত্তক নেন বলে কথিত আছে কিন্তু রাজবাড়ির বংশধরদের এবং সম্পত্তির উইল অনুসারে দত্তক নেন গোপীমোহনের পুত্র রাধাকান্ত দেবকে এবং সম্পূর্ণ সম্পত্তি তাঁকে লিখে দেন নবকৃষ্ণ দেব। রাজপরিবারের বক্তব্য অনুসারে নবকৃষ্ণ দেব যখন মারা যান তখন তাঁর স্ত্রী গর্ভবতী ছিলেন এবং নবকৃষ্ণ দেব মারা যাবার পর তাঁর পুত্র রাজকৃষ্ণ জন্মগ্রহণ করেন। এই সময় সম্পত্তির ভাগ দাবি করেন নবকৃষ্ণ দেবের স্ত্রী। এইসময়ে রাধাকান্ত দেব আসল যে সম্পত্তি পেয়েছিল তাঁর ভাগ না দিয়ে সমপরিমাণ সম্পত্তি নিজে তৈরি করে দিয়েছিলেন তাঁর ফলশ্রুতি হল দক্ষিণ পাশের রাজবাড়ি। অর্থাৎ সেটিও শোভাবাজার রাজবাড়িরই একটি অংশ।

নবকৃষ্ণ দেব নিজের পণ্ডিত সভা তৈরি করেছিলেন এই সভায় শাস্ত্রীয় বিধান দেবার ব্যাবস্থাও করেছিলেন এবং উপযুক্ত বিধানের পরিবর্তে পণ্ডিতদের পুরস্কৃত করাহত। এই পণ্ডিত সভার প্রধান ছিলেন জগন্নাথ তর্কপঞ্চানন। এরপর এই পণ্ডিত সভা সফল ভাবে পরিচালনা করেছিলেন এবং স্ত্রী শিক্ষার বিশেষ অনুরাগী ছিলেন। তিনি সবসময়ে চাইতেন যে মেয়েরা শিক্ষিত হোক সেই সাথে তিনি পর্দা প্রথারও সমর্থক ছিলেন। রাধাকান্ত দেবের মেয়ে সংস্কৃত, হিন্দি এবং ইংলিশ-এ পণ্ডিত হয়ে ওঠেন এবং রাধাকান্ত দেব হিন্দু কলেজ এবং মেয়েদের বেথুন স্কুল প্রতিষ্ঠার একজন বিশেষ উৎসাহী ছিলেন“কলকাতার শিক্ষা ব্যাবস্থার বিকাশ” ব্লগে বলেছি।এবং এখানেই শেষ নয় তিনি গরিব চাষিদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন নীল বিদ্রহের সময়ে এবং তারই অনুমতিতে দীনবন্ধু মিত্র ‘নীলদর্পণ’ নাটকটি লেখেন।এছাড়া তিনি প্রথম ব্যাক্তি যিনি তাঁর সম্পত্তি মেয়েদের মধ্যেও ভাগ করে দিয়েছিলেন। আবার রামমোহনের সতীদাহ প্রথা ও বিদ্যাসাগর-এর বিধবা বিবাহ আইনের চুড়ান্ত বিরোধী ছিলেন। অদ্ভুত চরিত্র বটে!

নবকৃষ্ণ দেব-এর পড়ে রাধাকন্তু দেব যিনি কলকাতার একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন এবং শিক্ষা বিশেষত নারীশিক্ষায় তাঁর যথেষ্ট অবদান আছে যা আগেই বলেছিএছাড়া সংস্কৃত সাহিত্তে তাঁর অবদান কল্পনার অতিত। তিনি ৪০ বছরের চেষ্টায় ৮ খণ্ডে “শব্দকল্পদ্রুম” রচনা করেন যা সংস্কৃত সাহিত্তের একটি অমূল্য সম্পদ এবং এই বই তাঁর রুচি এবং শিক্ষার পরিচয় বহন করে।
কিন্তু শোভাবাজার নামটা কীভাবে এল? অনেক পরস্পর বিরোধী মতবাদ আছে। নবকৃষ্ণ দেব মাতৃ শ্রাদ্ধে ১০ লক্ষ টাকা ব্যায় করেছিলেন এবং একটি বিরাট সভা বসিয়েছিলেন এই থেকে এই অংশের নাম হয় সভাবাজার যা অপভ্রংশ হয়ে হয় শোভাবাজার। আবার একদল ঐতিহাসিক বলেন যে শোভারাম বসাকের নাম থেকে হয় শোভাবাজার। নবকৃষ্ণ দেব প্রথম যিনি কলকাতায় ঘোড়ার গাড়ি কিনেছিলান।

১৮৯৭ সালে স্বামী বিবেকানন্দ অসাধারন বক্তৃতা দেওয়ার পর তাঁকে এই বাড়িতে সংবর্ধনা দেওয়া হয় যা নবকৃষ্ণ স্ট্রীটের উত্তর পাশের বাড়িটিতে এবং সেই সংবর্ধনা স্থানে ঠাকুর দালানের সামনে একটি ফলক আছে বিবেকানন্দের নামে। হয়ত সকলেই দেখেছেন।

এই পরিবারের অনেকেই পরবর্তীতে অনেক সেবা মূলক ও সামজিক কাজে যুক্ত ছিলেন। তত্ত্ববোধিনী পত্রিকার প্রথম সম্পাদক অক্ষয়কুমার দত্ত এই পরিবারের একজন সদস্য এবং এই বংশের পরবর্তী উত্তরাধিকারী বিনয়কৃষ্ণ দেব বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদে জমি এবং অর্থ দান করেছিলেন। পরবর্তীতে এই পরিবারের অনেকেই নানা ক্ষেত্রে প্রসিদ্ধ আবার আধুনিক যুগের অনেকেই আইনি পরামর্শ দাতা হিসাবে দেশে প্রসিদ্ধি লাভ করেছেন।

শেষে এটুকু বলতে পারি আজও নিজেদের ঐতিহ্য বহন করে শোভাবাজারের দুটি রাজবাড়ি নিজের বংশ গরিমাকে বজায় রেখে চলেছেন এবং পুরনো প্রাচ্য সংস্কৃতির গন্ধ আজও এই দুটি রাজবাড়িতে গেলে পাওয়া যায়।  

sovabazar rajbari google map link: https://goo.gl/maps/5nZUnLkh4zcdA1jT9     
চাঁদনী চক বাজার- লটারির পুরস্কার



অদ্ভুত শুনতে লাগল? 

হ্যাঁ কলকাতায় এই অদ্ভুত ব্যাপার হত নাকি ? 

কিন্তু লটারি জিতে চাঁদনি চকের মালিক ব্যাপারটা সত্যিই গোলমেলে।

কিন্তু ভয় নেই গোলমাল ব্যাপারটা সমাধান করব বলেই না আমি আপানদের গল্প বলতে বসেছি।
লটারির ব্যাপারটাতে পরে আসছি। আগে মালিকের গল্পটা একটু বলেনি।

পলাশীর যুদ্ধের পর কলকাতাতে অনেকেই হঠাৎ করে বড়লোক হয়ে ওঠেন। তাদের মধ্যে গোকুলচন্দ্র মিত্র অন্যতম। ১৭২৪ খ্রিষ্টাব্দে বর্তমান দক্ষিণেশ্বরের নিকট বালিতে তাঁর জন্ম। ১৭৪২ খ্রিষ্টাব্দে বর্গী আক্রমণের সময়ে তিনি তাঁর বাবার সাথে কলকাতাতে চলে আসেন এবং প্রথমে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে হাতি ঘোড়ার রসদ সরবরাহের ব্যাবসা শুরু করেন এবং পরবর্তীতে নুনের প্রায় একচেটিয়া ব্যাবসা শুরু করেন এবং মা লক্ষ্মীর কৃপায় অল্প সময়ই ধনবান হয়ে ওঠেন। কিন্তু শুধু মা লক্ষ্মী নয় ভাগ্যদেবীর কৃপাও যে সবসময়ে তাঁর সাথে ছিল তা বোঝা যায় ১৭৮৪ সালে(সালটি নিয়ে মতান্তর আছে।)। লটারিতে জিতে তিনি পেলেন চকের বাজার। আর সেই থেকেই চাঁদনী চকের মালিক হলেন গোকুলচন্দ্র মিত্র। কথিত আছে একবার বিষ্ণূপুরের রাজা তাঁর কাছে রাজপরিবারের গৃহদেবতা মদনমোহন বিগ্রহকে রেখে ১ লক্ষ টাকা ধার নিয়েছিলেন। সেই সময়ে গোকুলচন্দ্র মিত্র অনুরুপ ওপর একটি বিগ্রহ তৈরি করান এবং বিষ্ণূপুরের রাজ পরিবার কে সেই নকল মূর্তি দিয়েছিলেন টাকা ধার দেওয়ার পরে এবং আসল বিগ্রহটি নিজের বাড়িতে প্রতিষ্ঠিত করেন। সেই থেকে ওই অংশের নাম হয় ‘মদনমোহন তলা’। গোকুলচন্দ্র মিত্র একটি গঙ্গার ঘাটও তৈরি করেছিলেন যার আজকের নাম্ ‘গোকুল মিত্রের ঘাট’।

আজকের বর্তমান মদনমোহন তলা এবং চাঁদনী চক বাজারের মধ্যে প্রায় ৩কিমি এর দূরত্ব কিন্তু আজের চাঁদনী চক বাজার ও মদনমোহন তলা সম্পূর্ণ নিয়েই ছিল সেদিনকার চকের বাজার বা চাঁদনিচক বাজার।

এবার সব অদ্ভুত ব্যাপারের সমাধান করব। লটারির বদলে কিভাবে এতবড় সম্পত্তি জিতে নেওয়া কিভাবে সম্ভব। আসলে পলাশীর যুদ্ধের পর কলকাতার সম্পূর্ণই অধিকার ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে যাওয়ার পর দেখা দিল এক সমস্যা। এত সম্পত্তি সামলাবে কে? তাহলে উপায়? সম্পত্তি বিলিয়ে দিয়ে হবে তাতে সম্পত্তির দেখশোনাও হবে আবার রাজস্ব আসবে। কিন্তু আবার সম্পত্তি যে দেব কি উপলক্ষে আর সবাইকে তো দেওয়াও যাবেনা। এই সময়ে ইংল্যান্ডের জনপ্রিয় খেলা লটারির কিছু পরিবর্তন হল বিজেতাকে দেওয়া হবে টাকার বদলে সম্পত্তি। আর টিকিত জাতে সকলে কিনতে না পাড়ে অর্থাৎ জাতে সম্ভ্রন্ত বড়লোকরাই টিকিত কিনতে পারে তাঁর জন্য দাম রাখা হল ৫০ টাকা।
কিন্তু এই পদ্ধতি শুরু হয়েছিল কবে? অনেকের মতে অষ্টাদশ শতেকর ৮০র দশকের গোড়াতেই শুরু হয়েছিল আবার অনেকের মতে ১৭৯১ খ্রিষ্টাব্দে শুরু হয়েছিল এই ব্যাবস্থা। প্রথমে বেসরকারি ভাবে শুরু হয়েছিল ১৮০৯ সালে গভর্নর জেনারেল সরকারী ভাবে বসালেন লটারি কমিটি। এর পরে লর্ড ওয়েলেসলি এই কমিটির প্রসার ঘটালেন। ১৮০৯-১৮১৭ সালের মধ্যে কোম্পানি ১২ লক্ষ টাকা আয় করেছিল শুধু লটারির টিকিত বিক্রি করে। কিন্তু আকচমকাই ১৮৩৬ খ্রিষ্টাব্দে এই কমটির অবলুপ্তি ঘটানো হয়।

এই অবলুপ্তি কারণ হিসাবে অনেকে অনেক মতামত প্রকাশ করেন। অনেকে বলেন যে দেশের জনগন নৈতিকতার প্রশ্ন তুলেছিল। কিন্তু শুধুমাত্র নেটিভদের প্রশ্নে কোম্পানি তাঁর লাভজনক ব্যাবসা তুলে দেবে সেটা কেমন করে হতে পারে? আবার অনেকে বলেন যে কোম্পানি এই ব্যাবসায় লাভ করেত পারছিলনা। কিন্তু শেষ দশ বছরে কোম্পানি ১০,১৯,৩৪৯ টাকার টিকিট বিক্রি করেছিল তাহলে ক্ষতি কেমন করে হয়? অর্থাৎ উত্তরটা আজও অজানাই থেকে গেছে এখনো। 

দাঁড়ান একটু চমকেদি।কর্নওয়ালিস স্ট্রীট, আমহাস্ট স্ট্রীট, মানিকতলা, বউবাজার, ওয়েলিংটন স্ট্রীট, এই রাস্তা গুল দিয়ে হেঁটে জানত? সবই কিন্তু লটারির দান। দাঁড়ান। চীনে ব্রেকফাস্ট খেটে টেরিটি বাজার জানত? সেটাও কিন্তু লটারির দান১৭৯১ সালে চার্লস ওয়েস্টন লটারি জিতে পেয়েছিলেন এই জায়গাটি।

তাহলে কলকাতাকে লটারির শহর বলাই যায় কি বলেন?   

 মার্বেল প্যালেস এবংরাজেন্দ্র মল্লিক



আগের দিন তো শুনলেন পাথুরিঘাটার মল্লিক পরিবারের কথা। আসুন আজ জেনেনি অন্য এক মল্লিক পরিবারের কথা। রাজেন্দ্র মল্লিক ও তাঁর পরিবারের কথা।

রাজেন্দ্র মল্লিক সম্পূর্ণ ওপর এক মল্লিক পরিবারের, আগের মল্লিক পরিবারের কোন উত্তরসূরি মনে করে ভুল করবেন না যেন।


এই রাজেন্দ্র মল্লিক পরিবারের আদি পুরুষ ছিলেন মধু শীল। তাঁর অধস্তন ত্রয়াদশ পুরুষ যাদব শীল ‘মল্লিক’ উপাধি লাভ করেন সেই থেকেই এই বংশ মল্লিক উপাধি লাভ করেন। অধস্তন পঞ্চদশ পুরুষ জয়রাম মল্লিক বর্গী হামলার ভয়ে কলকাতায় এসে বসবাস শুরু করেন। কলকাতায় এসে গোবিন্দপুর অংশে বসবাস শুরু করেন। কিন্তু গোবিন্দপুরে নতুন দুর্গ নির্মাণ শুরু হলে তিনি তাঁর বসতি উঠিয়ে নিয়ে কলকাতার চোরাবাগান অংশে বসতি শুরু করেন।

রাজেন্দ্র মল্লিক হলেন জয়রাম মল্লিকের অধস্তন ষষ্ঠ পুরুষ। জয়রামের পুত্র পদ্মলোচন, পদ্মলোচনের পুত্র শ্যামসুন্দর, শ্যামসুন্দরের পুত্র গঙ্গাবিষ্ণূ, গঙ্গাবিষ্ণুর পুত্র নীলমণি এবং এই নীলমণির পুত্র হলেন রাজেন্দ্র মল্লিক।

জয়রাম মল্লিক কলকাতায় আসার সাথে সাথেই ব্যাবসা বাণিজ্যে হাতপাকালেও এই ব্যাবসার মূল শ্রীবৃদ্ধি করেন গঙ্গাবিষ্ণু মল্লিক।

কিন্তু আপনি যদি দুটো মল্লিক পরিবারকে গোলান তবে ভুল হবে তবে ১০০% ভুল হবেনা কারণ দুটি পরিবার আলাদা আলাদা হলেও তাদের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক আছে দীর্ঘদিনের। রাজেন্দ্র মল্লিকের প্রপিতামহ শ্যামসুন্দর মল্লিকের কন্যা ক্ষুদিমনি দেবীকে বিবাহ করেছিলেন পাথুরিঘাটার মল্লিক পরিবারের নিমাইচরন মল্লিক। আবার রাজেন্দ্র মল্লিকের পুত্রীর সাথে বিয়ে হয়েছিল নিমাইচরন মল্লিকের প্রপৌত্র প্রমথনাথ মল্লিকের বিবাহ হয়েছিল।

এইযে এতবার করে রাজেন্দ্র মল্লিকের কথা বলছি কেন?

রাজেন্দ্র মল্লিক ছিলেন নীলমণি মল্লিকের দত্তক পুত্র। কিন্তু তিনি ইংরাজি, ফারসি এবং সংস্কৃত ভাষায় বিশেষ পণ্ডিত হয়েছিলেন এবং বংশের ব্যাবসাকে নিজের শিক্ষা এবং বুদ্ধির বলে একাই বহুগুন বৃদ্ধি করেছিলেন।

১৮৬৫-৬৬ খ্রিষ্টাব্দে ওড়িশায় যখন দুর্ভিক্ষ হয়েছিল তখন কলকাতায় অন্নসত্র খুলে দুর্ভিক্ষপীড়িতদের সাহায্য করেছিলন রাজেন্দ্র মল্লিক। ১৮৭৮ খ্রিষ্টাব্দে ইংরেজ সরকার থেকে তিনি ‘রাজা বাহাদুর’ উপাধি লাভ করেন।

এবার আসি মার্বেল প্যালেসের কথায়। শুধুমাত্র নিজের প্রতিপত্তি দেখানো নয় বরঞ্চ নিজের শিল্প সত্তাকে প্রতিষ্ঠিত করবার জন্যই তৈরি করেছিলেন রাজেন্দ্র মল্লিক। ১৮২১ সালে তাঁর পিতা নীলমণি মল্লিক বর্তমান বাড়ির উত্তর-পশ্চিম কোনে একটি নিচু ছাদের জগন্নাথ মন্দির বানান এবং মন্দিরের পাশের পুকুরে একটি ফোয়ারা তৈরি করেন যা তৎকালীন এমনকি বর্তমান সময়ে কলকাতার শ্রেষ্ঠ স্থাপত্তের মধ্যে অন্যতম। পিতার এই শিল্প সত্তাকে দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে ১৮৩৫ খ্রিষ্টাব্দে সম্পূর্ণই মার্বেল পাথর নির্মিত প্রাসাদ তৈরি করেন।

এই ফোয়ারাটি এখনো আছে মার্বেল প্যালেসের লোহার গেট পেরিয়ে ঢুকলে প্রথমেই সামনে যে স্থাপত্যটি পর্বে সেটি হল নীলমণি মল্লিকের নির্মিত ফোয়ারা। শুধু তাই নয় এই মার্বেল প্যালেসে আজও রাজেন্দ্র মল্লিকের বংশধররা বসবাস করেন। আপনি চাইলে এই মার্বেল প্যালেস ঘুরে দেখতে পারেন তবে তাঁর জন্য অনেক অনুমতির বেড়াজাল পেরোতে হবে তবুও চেষ্টা করে দেখতে পারেন।

দাঁড়ান দাঁড়ান চললেন কোথায়? এখনো তো শেষ হয়নি। এবার শুনুন মার্বেল প্যালেসে রাজেন্দ্র মল্লিক তৈরি করেছিলেন নিজের বাক্তিগত চিড়িয়াখানা। সম্ভবত অয়াজাদ আলি শাহ্‌ এর পর রাজেন্দ্র মল্লিকই ব্যাক্তিগত চিড়িয়াখান প্রতিষ্ঠা করেন। এমনকি অয়াজাদ আলি শাহ্‌ এর মৃত্যুর পর তাঁর অনেক সম্পত্তি এবং ব্যাক্তিগত চিড়িয়াখানার বেশির ভাগই কিনে নেন রাজেন্দ্র মল্লিক। এরপর ১৮৬৭ সালে আলিপুর চিড়িয়াখান প্রতিষ্ঠার সময়ে নিজের ব্যক্তিগত সংগ্রহের অনেক পশুই তিনি দান করেন। আজও যদি মার্বেল প্যালেসে যান তাহলে আজও পাখিরালয় এবং হরিন দেখার সুযোগ মিললেও মিলতে পারে। 
চিড়িয়াখানার ইতিহাসের দ্বিতীয় পর্বে বলেছিলাম না যে অয়াজাদ আলি শাহ্‌ এর স্মৃতি বহন করছে মার্বেল প্যালেস। মিলল তো?


হারিয়ে যাওয়া নবাব ওয়াজিদ আলি শাহ্‌ এবং তার চিড়িয়াখানা(FORGOTTEN NAWAB WAJID ALI SHAH AND HIS ZOO) 

https://ojanakolkata.blogspot.com/2019/05/two-unknown-zoo-of-kolkatapart2.html


অষ্টাদশ শতাব্দিতে যারা বিপুল সম্পত্তির মালিক হয়েছিলেন তাদের মধ্যে পাথুরিঘাটার মল্লিক পরিবার বিশেষ উল্লেখ যোগ্য। এই মল্লিক পরিবারের আদি পুরুষ সোমভদ্র দেব।  তাঁর ২২তম অধস্তন পুরুষ হলেন বৈদ্যনাথ দেব। তাঁর পুত্র কৃষ্ণদাস এবং কৃষ্ণদাসের পুত্র রাজারাম মল্লিক উপাধি নিয়ে ত্রিবেণী ত্যাগ করে কলকাতায় এসে বসবাস শুরু করেন। রাজারামের পুত্র দর্পনারায়ন মল্লিক  এবং রাজারামের অনুজ প্রাণবল্লভের পুত্র শুকদেব মল্লিক কলকাতাতেই জন্মগ্রহণ করেন। দর্পনারায়নের পুত্র নয়নচাঁদ ১৭১৩ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতায় জন্ম গ্রহন করেন।


এবার আসি আসল কথায় পলাশির যুদ্ধের পর মীরজাফর কলকাতা আক্রমণের ক্ষতি পুরন হিসাবে কয়েক কোটি টাকা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে দান করেন। এই টাকা ভাগ করার জন্য ১৩ জন নেটিভ কমিশনার নিযুক্ত করা হয়। এই ১৩ জনের মধ্যে এই পরিবারের শুকদেব এবং নয়নচাঁদ দুজনেই ছিলেন। এছাড়া আগে যাদের কথা বলেছি অর্থাৎ শোভারাম বসাক, রতন সরকার এবং গোবিন্দরাম মিত্র সকলেই ছিলেন।

বর্তমান কলকাতার মল্লিক বংশ এই শুকদেব এবং নয়নচাঁদদের বংশ থেকেই উদ্ভূত। নয়নচাঁদের ছেলে নিমাই চরণ মল্লিক কলকাতার বিখ্যাত ব্যাক্তিদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন। কারণ তিনি মুর্শিদাবাদের জগৎ শেঠের থেকেও ধনী ছিলেন। তিনি ইংরেজদের সাথে মিলে আমদনি-রপ্তানির ব্যাবসা করে কোটি কোটি টাকা উপার্জন করেন। তিনি নুন এবং জমিজমার ফাটকা খেলে বেশ কিছু টাকা অপচয় করলেও বেশ কয়েক কোটি টাকা রেখে যান। কিন্তু ভাগের মা গঙ্গা পায় না। এই টাকার ভাগ কে কত নেবে তাই নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে দীর্ঘ কয়েক বছর মামলা চলেছিল নিমাই চরণের আট পুত্রের মধ্যে এবং ৬ লক্ষ টাকা ব্যায় হয়েছিল।

কিন্তু নিজেদের মধ্যে ঝামেলা করলে কিহবে এই ৮জন পুত্রের মধ্যে কয়েকজন বেশ খ্যাতনামা ব্যক্তি হয়েছিলেন।

নিমাই চরনের জ্যেষ্ঠ পুত্র রামগপাল সিঁদুরিয়া পটিতে নিজের বাড়ি তৈরি করেন এবং ওই বাড়িতেই হিন্দু মেট্রোপলিটান কলেজ এবং মেট্রোপলিটান থিয়েটার প্রতিষ্ঠা হয়। এই থিয়েটারে অনুষ্ঠিত হয় ‘বিধবা বিবাহ’ নাটক।

নিমাই চরনের কনিষ্ঠ পুত্র মতিলাল মল্লিক পাথুরিঘাটার মল্লিক বাড়িটি নির্মাণ করেন। মতিলাল মল্লিকের দত্তক পুত্র যদুলাল মল্লিক ১৮৭৩-৮৫ সময়কালে কলকাতা কর্পোরেশনের কমিশনার ছিলেন। এই পদে থাকাকালীন সরকারী কর্মচারিদের কঠোর সমলচনার জন্য  কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান স্যার হেনরি হ্যারিসন তাঁকে “দ্যা ফাইটিং কক” নামে অভিহিত করেন। ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস-এর একজন অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য।  

পঞ্চম পুত্র রামমোহন মল্লিক বড়বাজার ক্রস স্ট্রীটে বাড়ি তৈরি করেন।

সপ্তম পুত্র স্বরূপচাঁদ মল্লিক মুক্তারাম বাবু স্ট্রীটে রাজা রাজেন্দ্র মল্লিকের বাড়ির পূর্ব দিকে নিজের বাড়ি তৈরি করেন এবং পিতৃ শ্রাদ্ধে ৭লক্ষ টাকা এবং মাতৃ শ্রাদ্ধে ২লক্ষ টাকা ব্যয় করেন। তাঁর অর্থ সাহায্যেই ভাবানিচরন বন্দ্যোপাধ্যায় পুঁথির আকারে হিন্দু শাস্ত্র সমূহ প্রকাশ করেন। এছাড়া তিনি হিন্দু ধর্মের প্রচারের জন্য উইলে ৩২লক্ষ টাকা বরাদ্দ করেন।

নিমাই চরন নিজে একটি গঙ্গার ঘাট তৈরি করে দিয়ে গিয়েছিলেন এবং সেই ঘাটই আজকের নিমাই চরন মল্লিক ঘাট। নিমাই চরন মল্লিকের প্রপৌত্র দেবেন্দ্রনাথ মল্লিক ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দে আর.জি.কর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে একটি আউটডোর বিভাগ এবং কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে একটি চক্ষু হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দে তিনি রাজা উপাধি পান।

আজ এই অবধি সামনের দিন বলবো আর এক মল্লিক পরিবারের কথা।


অষ্টাদশ শতকের প্রথম দিকে অর্থাৎ গোবিন্দরামের প্রায় সমসাময়িক আরও দুজন ধনী ব্যক্তির কথা শোনা যায়। তারা হলেন রতন সরকার এবং শোভারাম বসাক।
রতন সরকার পরিচিত ছিলেন রাতু সরকার নামে। কলকাতায় আসার পর রতন সরকার তৎকালীন সম্ভ্রন্ত ব্যক্তি নন্দরামের আশ্রিত হিসাবে থাকতে শুরু করেন এবং তিনি জাতিতে ছিলেন ধোপা। কথিত আছে ১৬৭৯ খ্রিষ্টাব্দে ‘ফ্যালকন’ নামে একটি জাহাজ কলকাতায় এসে পৌছায়। সেই জাহাজের ক্যাপ্টেন মিস্টার স্ট্যাফর্ড নন্দরামের কাছে একজন “ধুবাস” বা দোভাষী চেয়ে পাঠান। কিন্তু নন্দরাম বোঝেন যে ক্যাপ্টেন হয়ত ধোপার খোঁজ করছেননন্দরান রতন সরকারকে পাঠিয়ে দেন। কিন্তু চতুর নন্দরাম ফিরে আসেননি, কোনমতে কাজ চালিয়ে দেন। ফলে ইংরাজ সহচর্জে বেশ কিছু টাকা উপার্জন করেন। আবার কথিত আছে যে রতন সরকার ইংরেজদের কাছে মেয়ে সরবরাহ করে প্রচুর অর্থ উপার্জন করেন।

কিন্তু কলকাতার বড়লোক এই বিষয় নিয়ে যারা গবেষণা করেন তাদের এক অংশের মতে রতন সরকার কে নন্দরাম ক্যাপ্টেন মিস্টার স্ট্যাফর্ড-এর কাছে পাঠাননি, তাঁকে পাঠিয়ে ছিলেন পোস্তার নকু ধর বা লক্ষ্মীকান্ত ধর। পরে অবশ্য এই ভুল ভাঙ্গে কারণ নকু ধর অনেক পরের সময়ের লোক। নকু ধর লর্ড ক্লাইভ এবং পরবর্তী অন্যান্য গভর্নরদের বেনিয়ান হিসাবে কাজ করে প্রচুর অর্থ উপার্জন করেছিলেন। এই নকু ধরই পোস্তার রাজ বংশের প্রতিষ্ঠাতা। নকু ধরের দৌহিত্র ও উত্তরাধিকারী সুখময় রায় তীর্থযাত্রীদের সুবিধার জন্য উলুবেড়িয়া থেকে পুরী পর্যন্ত পাকা রাস্তা তৈরি করে দেন।

রতন সরকারের নামেও কলকাতায় দুটি রাস্তা আছে। রতন সরকার গার্ডেন স্ট্রিট যা মাথা ঘষা গলি নামে পরিচিত। এবং কলুটোলার রতু সরকার লেন।



এবার আসি শোভারাম বসাক-এর কথায়। শোভারাম বসাক ছিলেন জাতিতে তন্তুবায়। ১৬৯০ খ্রিষ্টাব্দে মুর্শিদাবাদে জন্মগ্রহণ করেন এবং পরবর্তীতে উঠে আসেন সপ্তগ্রামের হলদিপুরে। হলদিপুরে থাকা কালীন তিনি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সুতো এবং কাপরের ব্যাবসা শুরু করেন এবং অল্প সময়তেই কোটিপতি হয়ে ওঠেন। ব্যাবসা ফুলেফেপে ওঠার পরে তিনি চলে আসেন কলকাতায় এবং শেঠদের বাড়ির কাছে তিনি নিজের বসত বাড়ি তৈরি করেন ও সেখানে জগন্নাথ-বলরাম-সুভদ্রার মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেন। গোবিন্দপুরে ইংরাজরা নতুন দুর্গ নির্মাণ শুরু হলে তিনি উঠে আসেন বড়বাজার অঞ্চলে। বড়বাজারে তাঁর বাড়ির সামনের রাস্তাটাই আজকের শোভারাম বসাক স্ট্রীট। শোভারাম বসাক নিজের নতুন বাড়ির পশ্চিমে গঙ্গার তীরে নতুন মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন এবং জগন্নাথদেবকে সেখানে প্রতিষ্ঠা করেন। ওই মন্দিরের পাশে তিনি স্নানের জন্য ঘাট তৈরি করেন। সেই ঘাটই আজকে জগন্নাথ ঘাট নামে পরিচিত। ১৭৭৩ খ্রিষ্টাব্দে শোভারাম বসাক কলকাতাতেই মারা যান।

আজ এই অবধি সামনের দিন আবার আসব কোন পরিবারের গল্প নিয়ে।


গোবিন্দরাম মিত্র-দ্যা ব্ল্যাক জমিদার? মানে কি? অসৎ উপায়ে জমিদার হয়েছিলেন?

না। আসলে এটা ছিল সরকারি পদ।

এরকম অদ্ভুত নাম কেন?  

সবটা জানতে চান? তাহলে পড়ুন।

সময়টা ছিল কোম্পানির শাসনের একেবারে শুরু। ১৭০০ সালের প্রথম দিক। কলকাতায় তখন কোম্পানির শাসন অনেকটা আধাস্বপ্ন- আধাবাস্তব এই অবস্থায় চলছে। কিন্তু ভালকরে ব্যাবসা করতে গেলে তো মোঘল বাদশার ফরমান দরকার। অনেক আলাপ আলোচনার পর অবশেষে ১৭১৫ সালে সারম্যান একজন দূত পাঠালেন ফারুখশিয়ারের কাছে। মনে পড়ছে ইতিহাসের সেই সারম্যান দৌত্যর কথা? হ্যাঁ এই পরিকল্পনা হয়েছিলো কলকাতাতে বসেই। অবশেষে ১৭১৭ সালে মিলল ঐতিহাসিক ফারুখশিয়ারের ফরমান। ফরমান অনুসারে তো পুরো বাংলাদেশে বিনা শুল্কে বাণিজ্য করার অধিকার কোম্পানি পেলই সেইসাথে পেল হুগলী নদীর উভয় তীরে প্রায় ১০মাইল অবধি ৩৮টি গ্রাম কিনে নেওয়ার অধিকার। এই অধিকার বলে কোম্পানি হয়ে গেলো সম্পূর্ণ ২৪ পরগণার জমিদার। ভাল করে দেখুন একটা জিনিস, জমদার হল কিন্তু কোম্পানি অর্থাৎ কোন একজন লোক নয়। তাহলে জমদারি চালাতে গেলে তো একজন প্রশাসকের দরকার। এই সময়ে কোম্পানি তৈরি করল ‘জমিদার’ নামের একটি পদ যিনি কলকাতা তথা পুরো বাংলাদেশ শাসনের সর্বেসর্বা। তাঁর হাতে দেওয়া হল জমিদারির সমস্যা বিচার থেকে আইন ভঙ্গ কারির সাজা ঘোষণা সব। এমনকি তিনি চাইলে কোন অভযুক্তর ফাঁসি অবধি দিতে পারেন তবে তার জন্য কোম্পানির মূল কতৃপক্ষের অনুমতি লাগত। আর মাসিক মাহিনা ২০০০ টাকা। কিন্তু সমস্যা হল অন্য যায়গায়। যারা জমিদার হয়ে কলকাতায় আসবে তারা তো আর জানেনা যে কলকাতা তথা বাংলাদেশের সামাজিক অবস্থা ঠিক কেমন। তবে উপায়। তৈরি হল ডেপুটি জমদার পদ। এই পদে নিয়োগ করা হবে একজন নেটিভ বা দেশি লোক। এই ডেপুটি জমিদার পদের নাম কোম্পানির সাহেব কর্মচারীরা দিয়েছিলেন ব্ল্যাক জমিদার।

১৭২০সাল প্রথম ব্ল্যাক জমিদার হিসাবে নিযুক্ত হলেন গোবিন্দরাম মিত্র।প্রায় ৩৫ বছর এই পদে আসীন ছিলেন তিনি। মাসিক মাহিনা মাত্র ৩০ টাকা। কিন্তু এই পদ নিয়ে ইতিহাসে একটি কথা প্রচলিত আছে যে “এই পদে যে খুটে খতে পারবে তার আর খাওয়ার অভাব হবেনা” অর্থাৎ অসৎ উপায়ে প্রচুর আয় কিন্তু কাজ করতে হবে কোম্পানি বাহাদুরের চোখ এড়িয়ে। ধূর্ত গোবিন্দরাম এই পথে এতবেশি উপার্জন করলেন যে একজন দেশীয় জমিদারের সমান সম্পত্তি করে ফেললেন, কিন্তু তার নিষ্পাপ বহিঃআচরণ কোনভাবেই কোম্পানির কর্তাদের মনে আচরণের সৃষ্টি করেনি। কিছু বছর পর তিনি কোম্পানির কাছে আবেদন করলেন মাহিনা বাড়ানোর। মঞ্জুর হল সেই আবেদন নতুন মাসিক মাহিনা হল ৫০ টাকা। সে যাইহোক সাথে তো উপরি ইনকাম আছেই। অনেক টাকার মালিক গোবিন্দ রাম প্রতিষ্ঠা করলেন কুমোরটুলি মিত্র বাড়ি। এবং হালসীবাগানের উত্তরে নন্দবাগানে তৈরি করলেন নিজেস্ব বাগানবাড়ি। কিন্তু যে কাজের জন্য তিনি ইতিহাসে পরিচিত তাহল চিৎপুরের নবরত্ন মন্দির প্রতিষ্ঠা। এই মন্দির ছিল হলয়য়েল মনুমেন্টের থেকেও উঁচু এবং মন্দিরের চুড়ার ওপরে ছিল সোনার তৈরি ধ্বজা এবং মন্দিরে পূজিত হত শিব মূর্তি। পরবর্তী কালে এই মন্দিরে আনা হয় কালী মূর্তি। ঝড়ে ধ্বংস হয়ে গেলেও মন্দিরের সবথেকে ছোট গম্বুজটি আজও আছে। এই মন্দিরেরই আজকের চিৎপুরের সিদ্ধেশ্বরী কালী মন্দির।


কিন্তু সুখ বেশিদিন সহ্য হয়না। ১৭৫২ সালে গোবিন্দরামের জীবনে জীবন্ত শনি হয়ে এলেন John Zephaniah Holwellযথেষ্ট চতুর এবং বুদ্ধিমান লোক ছিলেন হলওয়েল। কলকাতাতে এসে গোবিন্দরামের সম্পত্তি দেখেই সন্দেহ হয়, জানতে চান তার আয়ব্যয় এবং জমার হিসাব। এমনকি তার আয়ের সমস্ত উৎস সম্পর্কে জানতে চাইলেন। আর যদি গোবিন্দরাম সেটা না জানান তাহলে জেল অথবা ফাঁসি। কিন্তু যে এতদিন উপরি কামাই করেছে সেকি আর সহজে দমে যাওয়ার লোক? সহজেই একে একে কোম্পানির কর্তাদের হাত করে নিতে লাগলেন। লোকের মুখে এই কথা চলত যে এসবই ব্ল্যাক জমিদারের ব্ল্যাক মানির কাজ। কিন্তু এতে শেষ রক্ষা হয়নি। ফাঁসি বা জেল হইনি ঠিকই কিন্তু বরখাস্ত হয়েছিলেন।

এইরকম অসৎ কাজ শুধু গোবিন্দরামেই থামে থাকেনি তাঁর ছেলে। রাধারাম মিত্র হাত পাকিয়ে ছিলেন দলিল জাল করার কাজে। এইকাজের জন্য তাঁর ফাঁসির দণ্ড হয়। এই মিত্র পরিবার এখনও আছে কিন্তু রাধারামের পরে এই পরিবারে আর অসৎ উপায়ে কাউকে আয় করতে শোনা যায়নি। এই পরিবারের সদস্য পঞ্চানন মিত্র (১৮৯২-১৯৩৬) ছিলেন এই দেশের প্রথম Anthropology-এর অধ্যাপক।  

শুধু চামড়ার নামেই ব্ল্যাক না, সমপরিমাণ ব্ল্যাক কারবারও ছিল কি বলেন?

আজ এই অবধি সামনের দিন বলবো দুজন ব্যক্তির কথা যারা জালিয়াতি নয় রীতিমত বুদ্ধি আর পরিশ্রমের জোরে বড়লোক হয়েছিলেন।