Showing posts with label DEVOLOPMENT OF EDUCATION SYSTEM IN BRITISH KOLKATA. Show all posts
Showing posts with label DEVOLOPMENT OF EDUCATION SYSTEM IN BRITISH KOLKATA. Show all posts

ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ এবং সংস্কৃত কলেজের পণ্ডিতবর্গ এবং তাদের অমর কীর্তি। 



১৮০০ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বর মাসে কলকাতায় ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ স্থাপিত হয়। এই কলজে সংস্কৃত এবং প্রাচ্য সাহিত্য এবং সভতার ইতিহাস পড়ানোর জন্য ১৮০১ খ্রিষ্টাব্দের ৪ মে তারিখে বিভিন্ন বিভাগের জন্য একদল পণ্ডিত নিযুক্ত করাহয়। প্রধান পণ্ডিত হিসাবে নিযুক্ত করাহয় পণ্ডিত মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কারকে এবং দ্বিতীয় পণ্ডিত হিসাবে নিযুক্ত করাহয়  রমানাথ বিদ্যাবাচস্পতিকে। এছাড়া সহকারী পণ্ডিতরা ছিলেন- শ্রীপতি মুখোপাধ্যায়, আনন্দচন্দ্র, রাজীবলোচন মুখোপাধ্যায়, কাশীনাথ মুখোপাধ্যায়, পদ্মলোচন চূড়ামণি এবং রামরাম বসু।

এর পরবর্তী কালে যারা ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের সাথে যুক্ত হয়েছিলেন তারা হলেন- তারিণীচড়ণ মিত্র, চন্ডীচরন মুন্সী, রামকিশোর তরকচূড়ামনি এবং কাশীনাথ তর্কপঞ্চানন প্রমুখ।

দেশীয় পণ্ডিতবর্গকে পুস্তক রচনায় উৎসাহ প্রদান করার জন্য কলেজ কতৃপক্ষ পুরষ্কার ঘোষণা করেন। কতৃপক্ষের এই উৎসাহের ফলে আমরা যেসব বই লাভ করেছি তা হল-
রামরাম বসু----‘রাজা প্রতাপাদিত্য চরিত্র’-----১৮০১ খ্রিষ্টাব্দ
রামরাম বসু----‘লিপিমালা’------১৮০২ খ্রিষ্টাব্দ
মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার-----‘বত্রিশ সিংহাসন’-----১৮০২ খ্রিষ্টাব্দ
মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার-----‘প্রবধচন্দ্রিকা’-----১৮০৩ খ্রিষ্টাব্দ
চন্ডীচরন মিত্র------‘ওরিয়েন্টাল ফেবুলিস্ট’----১৮০৩ খ্রিস্টাব্দ
চন্ডীচরন মুন্সী-----‘তেতো ইতিহাস’------১৮০৫ খ্রিষ্টাব্দ
রাজীবলোচন মুখোপাধ্যায়--‘মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র রয়াস্য চরিত্রং’--১৮০৫ খ্রিষ্টাব্দ
রামকিশোর তর্কচুড়ামনি---‘হিতোপদেশ’----১৮০৮ খ্রিষ্টাব্দ
রামমোহন প্রসাদ ঠাকুর---‘ইংরাজি বাংলা শব্দকোষ’—১৮১০ খ্রিষ্টাব্দ
রামমোহন প্রসাদ ঠাকুর---‘ইংরাজি ওড়িয়া অভিধান’—১৮১১ খ্রিষ্টাব্দ

হরপ্রসাদ রায়----‘পুরুষপরীক্ষা’-------১৮২১ খ্রিষ্টাব্দ
কাশীনাথ তর্কপঞ্চানন----‘পদার্থ কৌমুদি’---১৮২১ খ্রিষ্টাব্দ
কাশীনাথ তর্কপঞ্চানন----‘পাষণ্ডপীড়ন’---১৮২৩ খ্রিষ্টাব্দ
কাশীনাথ তর্কপঞ্চানন----‘সাধুসন্তষিনী’---১৮২৬ খ্রিষ্টাব্দ
কাশীনাথ তর্কপঞ্চানন----‘শ্যামাসন্তোষণ’---১৮৩৫ খ্রিষ্টাব্দ

যাদের কথা এতক্ষণ বললাম তারা সকলেই ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের সাথে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু কলেজের সাথে যুক্ত না থেকেও কলেজ কতৃপক্ষ গোলোকনাথ শর্মা(মুখোপাধ্যায়)এর রচিত ‘হিতোপদেশ’(১৮০২) ছাপাতে উৎসাহী হয়। এছাড়া চন্ডীচরন মুন্সী কতৃক ভাগবদগীতা’র বঙ্গানুবাদ করা হলেও তা ছাপানো হয়নি। আজ সেই পাণ্ডুলিপি রয়াল এশিয়াটিক সোসাইটির লাইব্রেরীতে রাখা আছে।

এইসময়ের সবথেকে বড় পণ্ডিত ছিলেন জয়গোপাল তর্কালঙ্কারের ভ্রাতুষ্পুত্র গৌরমোহন বিদ্যালঙ্কার যিনি কলকাতা স্কুল বুক সোসাইটির সম্ভ রূপে কাজ করে গেছেন।জয়গোপাল তর্কালঙ্কার ১৮০৫ থেকে ১৮২৩ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত শ্রীরামপুর মিশনে চাকরি করেছেন এবং সমাচার দর্পণের সম্পাদকীয় বিভাগের কর্ণধার। পরবর্তীকালে তিনি সংস্কৃত কলেজে যোগদান করেন এবং সর্বোপরি তার পরিচয় হল তিনি হলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়ের শিক্ষাগুরু।

সংস্কৃত কলেজ প্রতিষ্ঠা এবং পণ্ডিতদের ভূমিকা।  

১৮২৪ খ্রিষ্টাব্দে ‘সংস্কৃত গভঃ কলেজ’ প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর যারা অধ্যাপনা করতেন তাদের নামের তালিকা
স্মৃতি শাস্ত্রের অধ্যাপক ছিলেন রামচন্দ্র বিদ্যালঙ্কার(স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের প্রপিতামহ)। ১৮২৫ খ্রিষ্টাব্দে তিনি মারাগেলে তার স্থলাভিষিক্ত হন কাশিনাথ তরকপঞ্চানন।

ন্যায়শাস্ত্রের অধ্যাপক ছিলেন বিখ্যাত নৈয়ায়িক নিমাইচন্দ্র শিরোমণি।

সাহিত্যের অধ্যাপক ছিলেন জয়গোপাল তর্কালঙ্কার।

ব্যাকরণের অধ্যাপক ছিলেন হরিপ্রসাদ তর্কপঞ্চানন এবং কীর্তিচন্দ্র ন্যায়রত্ন এবং ১৮২৫ খ্রিষ্টাব্দে যোগদান করেন গঙ্গাধর তর্কবাগীশ। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ১৮২৯ সালে সংস্কৃত কলেজে ছাত্র হিসাবে যোগদান করে তিনি গঙ্গাধর তর্কবাগীশের কাছে ব্যাকরণ অধ্যায়ন করেন।

বেদান্ত শ্রেনির অধ্যাপক ছিলেন কৃষ্ণদেব উপাধ্যায়। তার মৃত্যুর পর ২৯শে এপ্রিল ১৮২৬ খ্রিষ্টাব্দে শম্ভুনাথ বাচস্পতি এই বিভাগে অধ্যাপক হিসাবে যোগদান করেন।

অলঙ্কার শ্রেনির অধ্যাপক ছিলেন কমলাকান্ত বিদ্যালঙ্কার। তার পদত্যাগের পর ১৮২৭ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে নিযুক্ত হন নাথুরাম শাস্ত্রী নামে একজন গুজরাটি পণ্ডিত।

এছাড়া যত সময় এগিয়েছে আরও বিখ্যাত পণ্ডিত এই সংস্কৃত কলেজের সাথে যুক্ত হয়েছেন। যাদের মধ্যে অন্যতম আয়ুর্বেদ শাস্ত্রের মধুসূদন গুপ্ত যিনি এদেশে প্রথম শব ব্যাবচ্ছেদ করেছিলেন।

সংস্কৃত কলেজ প্রতিষ্ঠা হলেও চতুষ্পদী গুলিতে অধ্যাপনার কাজ চলছিল পুরদমে। সেইসময় চতুষ্পদী চালান ছাড়াও ব্রাহ্মন পণ্ডিতদের কাজ ছিল ‘পাতি’ দেওয়া বা সামাজিক কোন কাজে বিশৃঙ্খলা দেখাদিলে বিধান দেওয়া। উনবিংশ শতাব্দীর সবথেকে বড় সঙ্কট দেখা দিল রানি রাসমনি কতৃক দক্ষিণেশ্বরে মা ভবতারিণীর মন্দির প্রতিষ্ঠা নিয়ে। কলকাতার ব্রাহ্মণ সমাজ বিধান দিলেন যে কোন শুদ্রানির অধিকার নেই দেবতাকে ভোগ প্রদান করার। এই সময় ত্রাতা হয়ে এলেন ঝামাপুকুর চতুষ্পদীর রামকুমার ভাট্টাচার্য। তিনি বললেন যে যদি মন্দিরের সব সম্পত্তি কোন ব্রাহ্মণকে দান করেন তবে অন্ন ভোগ প্রদান করেত পারবেন। এই কথামত তিনি দক্ষিণেশ্বরযাবতীয় সম্পত্তি রানি তাঁর গুরুদেবকে দান করে দেন। কিন্তু তাঁর গুরুদেবের কেউই পুজা আর্চা করেননা। এইক্ষত্রেও রানিকে বিপদ থেকে রাক্ষা করলেন রামকুমার ভাট্টাচার্য। তিনিই পূজকরে মন্দির প্রতিষ্ঠা করলেন।  

উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকের কিছু বিখ্যাত পণ্ডিতবর্গঃ
এই সময়ের কিছু বিখ্যাত পণ্ডিত হলেন- হরিনাথ তর্কসিধান্ত(১৮২৯-১৮৮৯), মেহেশচন্দ্র ন্যায়রত্ন(১৮৩৭-১৯০৭), জীবনানন্দ বিদ্যাসাগার(১৮৪৪-১৯১০), সত্যব্রত সমাধ্যায়ী(১৮৪৬-১৯১১) এবং হরিনাথ সিদ্ধান্তবাগীশ(১৮৭১-১৯৬১)।

হরিনাথ তর্কসিধান্ত ছিলেন গৌড়ীয় নব্যন্যায়ের “নির্বাণোন্মুখ উজ্জ্বলতার শেষ স্ফূর্তি”। তিনি মুলাজড়ের বিখ্যাত সংস্কৃত বিদ্যালয়ের ন্যায়ের অধ্যাপক রূপে কাজ শুরুকরার কিছুদিনের মধ্যে নৈন্যায়িক হিসাবে তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়ে।

মহামহোপাধ্যায় মহেশচন্দ্র ন্যায়রত্ন কলকাতার সংস্কৃত কলজে প্রথমে অলঙ্কার শাস্ত্রের অধ্যাপক হিসাবে যোগদান করেন এবং পরবর্তীকালে তিনি সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ নিযুক্ত হন। হাওড়া থেকে আমতা রেললাইন তারই প্রচেষ্টায় তৈরি হয়। ইংরাজ সরকার তাকে সি.আই.ই উপাধি দিয়েছিলেন। কলকাতায় আজও তাঁর নামে একটি রাস্তা আছে, নাম ‘ন্যায়রত্ন লেন’।

জীবনানন্দ বিদ্যাসাগর ১৮৭০ খ্রিষ্টাব্দে সংস্কৃত কলেজ থেকে বি.এ পাস করেন এবং বিদ্যাসাগার উপাধি লাভ করেন। তিনি নিজ প্রচেষ্টায় টীকাসহ ১০৭টি এবং টীকাহীন ১০৮টি মূল্যবান সংস্কৃত গ্রন্থ প্রকাশ করেছিলেন।

সত্যব্রত সমাধ্যায়ী সেযুগের একজন প্রসিদ্ধ বৈদিক পণ্ডিত এবং বেদ প্রচারক ছিলেন। বুন্দিরাজ তাঁর বেদ-পারঙ্গমতায় চমৎকৃত হয়ে ‘সামশ্রমী’ উপাধি দেন। তিনি সামবেদ এবং অন্যান্য অনেক গ্রন্থ সম্পাদনা করেন।

মহাভারতের সারানুবাদ সম্পাদনা করে হরিদাস সিদ্ধান্তবাগীশ তাঁর অসাধারণ পাণ্ডিত্য প্রকাশ করেন এবং ‘মহামহোপাধ্যায়’ উপাধি লাভ করেন।

আজকের ইতিহাস বলা এখানেই শেষ করলাম। খুব তাড়াতাড়ি আবার শোনাব কলকাতার কোনোএক নতুন ইতিহাস।
----------------------------------------------- X -------------------------------------


কলকাতায় পণ্ডিতদের আগমন এবং হিন্দু আইনের রচনাঃ



কলকাতায় পণ্ডিতদের আগমনের মূল উদ্যোগতা ছিলেন শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রতিষ্ঠাটা রাজা নবকৃষ্ণ দেব। তিনি কলকাতায় পণ্ডিতসভা প্রতিষ্ঠার জন্য দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পণ্ডিতদের কলকাতায় এনেছিলেন। তিনি কলকাতার বিভিন্ন প্রান্তে চতুষ্পদী স্থাপনের জন্য অর্থ সাহায্য করতে থাকেন। এছাড়া তিনি নিজের বাড়িতে “বিচারের” আয়োজন করতেন এবং তাদের পরিতোষিক দিতেন। ১৮৫৪সালের ২১শে মে তারিখের প্রকাশিত ‘সম্বাদ ভাস্কর’ অনুসারে মহারাজ বাহাদুর একবার ১সপ্তাহ ব্যাপী বিচারের আয়োজন করেছিলেন এবং বিশেষ কিছু পণ্ডিত যেমন শঙ্কর তর্কবাগীশ, বলরাম তর্কভুষন, মানিক্যচন্দ্র তর্কভুষন, বানেশর বিদ্যালঙ্কার, জগন্নাথ তর্কপঞ্চানন প্রমুখ পণ্ডিতদের ১ লক্ষ টাকা পর্যন্ত পরতিষিক দিয়েছিলেন। এইসময় রঘুমণি বিদ্যাভুষন চিৎপুরের নবাব দেলয়ার জঙ্গ এর অনুমতিক্রমে চিৎপুরে একটি চতুষ্পদী স্থাপন করেন। নবকৃষ্ণ দেবের এই ধারা তার পৌত্র রাধাকান্ত দেবও বজায় রেখেছিলেন, তার সভাপতি ছিলেন কাশীনাথ তর্কালঙ্কার। হাতিবাগানে তার একটি চতুষ্পদী ছিল। এই সময়ের পণ্ডিতদের সাহিত্য চর্চা নিয়ে ওয়ার্ড সাহেব তার ।‘হিন্দুদের ইতিহাস,সাহিত্য এবং পৌরাণিক উপাখ্যান’ সম্পর্কিত বইয়ের চতুর্থ খণ্ডে বিস্তারিত ভাবে বর্ণনা করে গেছেন।

এতক্ষণ আমরা জেনেছি যে রাজারা শাস্ত্রীয় বিচারের আয়োজন করতেন এবং সেই বিচারে এবং বিজয়ই পণ্ডিতদের পুরস্কৃত করতেন। ইংরেজ শাসন আসার পড়ে ১৭৭৪ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতায় সুপ্রিমকোর্ট স্থাপন হল এবং এখানে হিন্দু ধর্ম সংক্রান্ত বিধান দেওয়ার জন্য পণ্ডিতদের আহবান করা হল। কারণ ঔরঙ্গজেবের সময় থেকে ‘ফাতাওয়া-ই-আলমগিরি’ নামে মুসলিম আইন শাস্ত্র ছিল কিন্তু হিন্দুদের এরম কোন আইন শাস্ত্র ছিলনা। এজন্যই বিচার বিভ্রাটে হিন্দু ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের ডাকা হত। হেস্টিংস এই সমস্যা সমাধানের জন্য হিন্দু আইন রচনার উদ্যোগ নেন। তিনি ১১জন পণ্ডিতকে নির্বাচন করেন এবং হিন্দুদের সনাতন ধর্ম গ্রন্থের ভিত্তিতে তাদের কাছে এই আইন শাস্ত্র রচনার ভার প্রদান করেন। তারা হলেনঃ রামগপাল ন্যায়লঙ্কার, বীরেশ্বর পঞ্চানন, কৃষ্ণজীবন ন্যায়লঙ্কার, বানেশ্বর বিদ্যালঙ্কার, কৃপারাম তর্কসিধান্ত, কৃষ্ণচন্দ্র সার্বভৌম, গৌরীকান্ত তর্কসিধান্ত, কৃষ্ণদেব তর্কালঙ্কার, সীতারাম ভট্ট, কালিশঙ্কর বিদ্যাবাগীশ এবং শ্যামসুন্দর ন্যায়সিধান্ত। এনারা প্রথমে যে আইনগ্রন্থটি রচনা করেন তা প্রথমে ফার্সি ভাষায় ও পরে ন্যাথানিয়াল ব্রাসি হলহেড ইংরাজিতে আনুবাদ করেন(১৭৭৫-১৭৭৬খ্রিঃ)।  কিন্তু এতবার ভাষান্তরিত হওয়ার কারণে গ্রন্থটি মূল গ্রন্থ থেকে পৃথক হয়ে পরে। সেজন্য পুনরায় একটি বিশুদ্ধ গ্রন্থ রচনার দরকার হয়ে পরে। তৎকালীন সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি স্যার উইলিয়াম জোন্স এই গ্রন্থ রচনার ভার দেন মিথিলার স্মার্ত পণ্ডিত সর্বরি ত্রিবেদীর ওপর। এবং এই ভার ত্রিবেদী অর্পন করেন একজন অদ্বিতীয় পণ্ডিতের ওপর। যার নাম জগন্নাথ তর্কপঞ্চান-এর ওপর। তিনি ৮০০ পাতার একটি পুস্তক রচনা করেন। যার নাম “বিবাদ ভুঙ্গার্নব” এবং ত্রিবেদী এই বইয়ের নামকরন করেন “বিবাদ সারার্নব”। সর্বপ্রথম হেস্টিংসের আমলে যে বইটি রচনা করা হয়েছিলো তার নাম হল “বিবাদর্ণব সেতু”। কোলব্রুক সাহেব জগন্নাথ তর্কপঞ্চান-এর বইটির ইংরাজি অনুবাদ করেন এবং নাম দেন “DIGEST OF HINDU LAW ON CONTRACTS & SUCCESSION.” 

আসুন জেনে নেওয়া যাক এই জগন্নাথ তর্কপঞ্চানন সম্পর্কে কিছুকথা.১৬৯৬ খ্রিষ্টাব্দে তার জন্ম।পিতার মৃত্যুর পর মাত্র ২৪ বছর বয়েসে তিনি অধ্যাপনা শুরু করেন এবং অল্প সময়ের মধ্যে নিজেকে একজন দক্ষ ও জ্ঞানী নৈয়ায়িক হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন এবং এই খ্যাতি দীর্ঘ ৭৭ বছর বজায় রাখেন। মহারাজা নবকৃষ্ণ দেবের পণ্ডিতসভাও অলঙ্কৃত করেছেন জগন্নাথ পণ্ডিত। রাজা নবকৃষ্ণ দেব তাঁকে পাকা বাড়ি এবং তালুক তৈরির জন্য অর্থ সাহায্য করেছিলেন। রাজা তাঁকে বার্ষিক ১ লক্ষ টাকা আয়ের একটি জমিদারী প্রদান করতে চাইলে তিনি বলেন যে এতে তার পরবর্তী প্রজন্ম বিলাসী হয়ে পর্বে এবং বিদ্যা চর্চা থেকে সরে আসবে তাই তিনি এই জমিদারী ফিরিয়ে দেন। ইংরেজরা তাঁকে জজ পণ্ডিত নিযুক্ত করতে চাইলে তিনি সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন। সারা জীবন নিজেকে বিদ্যা চর্চা এবং অধ্যাপনাতেই ব্যাস্ত রাখেন। ১৮০৭ খ্রিষ্টাব্দে ১১১ বছর বয়সে দেহত্যাগ করে।   

KOLKATA MEDICAL COLLEGE- HISTORY OF ESTABLISHMENT AND JOURNEY 

কলকাতা মেডিকেল কলেজ কলকাতার একটি সুপরিচিত এবং ভরসাযোগ্য চিকিৎসাক্ষেত্র সেই সাথে ডাক্তারি শিক্ষার একটি খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠান, যা ১০০ বছরের বেশি সময় ধরে নিজের সুখ্যাতি বজায় রেখেছে। আসুন জেনেনি এই মেডিকেল কলেজের প্রতিষ্ঠার ইতিহাস। 

১৮৩৫ খ্রিষ্টাব্দে মেকলে মিন্ট সংস্কার আইনে শিক্ষা প্রসারের নীতি ঘোষিত হওয়ার পর কলকাতা মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা গ্রহন করা হয়। কিন্তু এর আগে চিকিৎসা বিদ্যা প্রদানের জন্য ১৮২২ খ্রিষ্টাব্দে স্কুল ফর নেটিভ ডক্টরস প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১৮২৩ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতায় ‘দি ক্যালকাটা মেডিকাল এন্ড ফিজিক্যাল সোসাইটি’ প্রতিষ্ঠিত হয়। স্কুল ফর নেটিভ ডক্টরস ছাড়াও কলকাতা মাদ্রাসা এবং সংস্কৃত কলেজে সনাতনী আয়ুর্বেদিক চিকিৎসার পাঠ দেওয়া হত।

১৮৩৬ খ্রিষ্টাব্দে লর্ড বেন্টিঙ্কের সভাপতিত্তে মার্চ মাসে কলকাতা মেডিকেল কলেজের কার্যক্রম শুরু হয়। শিক্ষক পদে ডাঃ গুডিভ(মেডিসিন ও অ্যানাটমির অধ্যাপক), ডাঃ ব্রামলি, ডাঃ ওসানিসি ও আয়ুর্বেদ শিক্ষার জন্য সংস্কৃত কলেজের অধ্যাপক মধুসূদন গুপ্তকে নিয়োগ করাহয়। কিন্তু কলকাতার অনেক অধিবাসী এই মেডিকেল কলেজের সহযোগিতা করেনি। তাই সমাচার দর্পণ পত্রিকায় একটি খবর প্রকাশিত হয় যার সারমর্ম দাড়ায় এই যে, অশিক্ষিত এবং অদক্ষ বৈদ্যের জন্য প্রতিদিন শহরে প্রচুর লোক মারা যাচ্ছে। মেডিকেল কলেজের মতো অসুখের সঠিক চিকিৎসা হওয়ার স্থান নির্মাণ হলেও কেন লোকে এঁর সহযোগিতা করছে না তা সত্যি খুবই রহস্যময়।

কিন্তু এই মেডিকেল কলেজের দ্রুত উন্নতির জন্য এগিয়ে আসেন প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর। ১৮৩৬-এ ইংলিশম্যান পত্রিকায় প্রকাশিত খবর অনুসারে দ্বারকানাথ ঠাকুর মুক্তহস্তে ২০০০ মুদ্রা দান করেছেন এবং এও বলেছেন যে আগামী ৩ বছর বার্ষিক পরীক্ষায় যারা কৃতিত্বের সাথে পাস করবে তাদের সমপরিমান অর্থ পুরষ্কার হিসাবে দান করা হবে। রামগপাল ঘোষ ছাত্রদের পড়ার সুবিধার জন্য প্রচুর বই দান করেন।

আজকের যে মেডিকেল কলেজের ভবনটি দেখি সেটি তৈরি করেছিল বার্ন এন্ড কোম্পানি। মেজর এইচ ফ্রেজার এবং বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারস-এর কর্নেল ডব্লু এন ফরবেস দেখাশোনা করতে লাগলেন কাজের। বাবু মতিলাল শীল তার বাগানবাড়ির একটি অংশ ছেড়ে দেন এই ভবনটি তৈরি করবার জন্য। ১৮৪৮ খ্রিষ্টাব্দের ১৩ই সেপ্টেম্বর মার্কুইস অফ ডালহৌসি কলকাতা মেডিকেল কলেজের বর্তমান ভবনের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন। ১৮৫২সালে নতুন ভবনের দরজা খুলে যায় সর্বসাধারনের জন্য।

১৮৩৭ থেকে ৯ফেব্রুয়ারি ১৮৩৯ সালের ‘সমাচার দর্পণ’ এর তথ্য অনুসারে যারা বার্ষিক পরীক্ষায় পুরস্কৃত হয়েছিল তাদের নামের তালিকাঃ
প্রথম বছরে পুরস্কৃত ছাত্ররাঃ শিবচন্দ্র কর্মকার, নবীন চন্দ্র পাল, জে সি সাইমনসন, ঈশান চন্দ্র গাঙ্গুলি, ডবলিউ ফয়,  ঈশান চন্দ দত্ত, রাজাকৃষ্ণ দেব, অমর চরণ শেঠ, শ্যামাচরন দাস, দ্বারকানাথ গুপ্ত, গোবিন্দ চন্দ্র গুপ্ত, বেনিমাধব মজুমদার, জেমস পাট।

দ্বিতীয় বছরে পুরস্কৃত ছাত্ররাঃ রাজাকৃষ্ণ দে, ঈশ্বরচন্দ্র গাঙ্গুলি, শ্যামাচরন দত্ত, রামঅনারায়ন দাস, ঈশ্বরচন্দ্র দত্ত, পঞ্চানন শিরোমণি, উমাচরন শেঠ, যাদব ধর, নবীনচাঁদ মিত্র, দ্বারকানাথ গুপ্ত, রামকুমার দত্ত, কালিদাস মুখার্জি, আর জি হেমিন ও পরমানন্দ শেঠ।

তৃতীয় বছরে পুরস্কৃত ছাত্ররাঃ উমাচরন শেঠ, দ্বারকানাথ গুপ্ত, রাজকৃষ্ণ দে, নবীনচন্দ্র মিত্র ও শাম্যাচরন দত্ত।

মূল গোলমাল বাঁধল অন্য যায়গায়। সেকালে বাঙালি হিন্দু ব্যক্তিরা মৃতদেহ স্পর্শ করতনা এমনকি যেখানে মৃতদেহ রাখাহত সেইস্থান পরিষ্কার করার জন্য গোবর জল দিয়ে ধোয়া হত। কিন্তু অ্যানাটমি শিক্ষার জন্য মৃতদেহ কাটতে হত।  হিন্দু ছাত্ররা এই শব কাটার বিরোধিতা করল। এইসময় সবথেকে সাহসিকতার কাজ করলেন অধ্যাপক মধুসূদন গুপ্ত। তিনি ছাত্রদের জড়তা ও ভয় কাটাবার জন্য ১৮৫৬সালের জানুয়ারি মাসে মধুসূদন গুপ্ত তার ৪জন ছাত্রকে নিয়ে সকলের সামনে শব ব্যবচ্ছেদ করেন। বাঙালির ইতিহাসে এবং কলকাতার চিকিৎসা বাবস্থার ইতিহাসে এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ ও যুগান্তকারী  কাজ। কথিত আছে যে এই সাহসিকতার জন্য তোপধ্বনির মাধ্যমে তাঁদেরকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়।

১৮৬০এর দশকের গোড়ার দিকে দুজন বাঙালি প্রথম চিকিৎসাশাস্ত্রে সর্বোচ্চ ডিগ্রি এম.ডি পান। তারা হলেন ভোলানাথ বসু এবং মহেন্দ্রলাল সরকার।

১৮৮৪ সালের জুলাই মাসে  স্যার অ্যাশলে ইডেন ভারতীয় নারী ও শিশুদের জন্য আলাদা বিভাগ তৈরি করেন যে বিভাগে তিনি  কর্মী থেকে ডাক্তার সকলই ছিলেন মহিলা।

এই মেডিকেল কলেজ আজও তার কর্তব্যে অবিচল।  

কলকাতার শিক্ষা বাবস্থা নিয়ে অনেক তো কথা হল। শিক্ষা বাবস্থার বিকাশের ইতিহাস এখানেই শেষ করছি। কিন্তু শিক্ষা বাবস্থাকে এত সহজে ছেড়ে আমি দিচ্ছিনা। পরের সিরিজে আমাদের দেশের কিছু পণ্ডিত যারা সংস্কৃত, দর্শন এবং বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন তাদের কথা বলবো।
----------------------------------------------------------------------------------------------------------

HISTORY OF SCHOOL ESTABLISHMENT TO SPEND THE WOMEN EDUCATION IN KOLKATA



কলকাতাতে ছেলেদের শিক্ষা ব্যাবস্থা বিকাশের সাথে প্রায় সমান্তরাল ভাবেই নারী শিক্ষার বিকাশ হতে থাকে কলকাতাতে। উনবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিক থেকেই খ্রিষ্টান মিশনারিদের দ্বারা নারী শিক্ষার বিকাশের জন্য স্কুল প্রতিষ্ঠা হতে থাকে। কলকাতাতে মেয়েদের মধ্যে শিক্ষা বিকাশের জন্য ‘দি ফিমেল জুভেনাইল সোসাইটি ফর দি এষ্টাবলিশমেন্ট এন্ড সাপোর্ট অফ বেঙ্গলি ফিমেল স্কুল।’ নামে একটি খ্রিষ্টান মহিলা সমিতি গঠন করা হয়। এই সোসাইটি নন্দনবাগান অঞ্চলে প্রথম বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করে। এরপর থেকে এরা জানবাজার, চিৎপুর, শ্যামবাজার, বরানগর প্রভৃতি অঞ্চলে বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করতে থাকে। ১৮২২ খ্রিষ্টাব্দে নারী শিক্ষার গুরুত্ব বোঝাবার জন্য “স্ত্রীশিক্ষা বিধায়ক” পুস্তকটি প্রকাশ করাহয়। ১৮২৬ খ্রিষ্টাব্দে রাজা বৈদ্যনাথ রায় ২০০০০ টাকা ব্যায় করে হেদুয়ার পূর্ব দিকে ‘সেন্ট্রাল স্কুল’ নামে একটি বালিকা বিদ্যালায় স্থাপন করেন।

কিন্তু এইসকল স্কুলে শুধুমাত্র সাধারণ নিম্নবিত্ত ঘরের মেয়েরা পড়তে যেত। সম্ভ্রন্ত ঘরের মেয়েরা কি অশিক্ষিত থাকত? না। তারাও অনেক উচ্চ মানের পড়াশুনা শিখত। সেই সময় যেহেতু সম্ভ্রন্ত ঘরে পর্দা প্রথা প্রচলিত ছিল সেহেতু মেয়েদের বড়ির ভেতরেই রেখে শিক্ষক মারফত পড়াশুনা শেখান হত। এই শিক্ষা ব্যাবস্থা কে বলাহত বৈষ্ণবী শিক্ষা ব্যাবস্থা। এই শিক্ষা ব্যাবস্থাতেই শিক্ষা লাভ করে রাজা শিবচন্দ্র রায়ের মেয়ে হরসুন্দরি দেবী বাংলা, সংস্কৃত এবং হিন্দি ভাষায় বিশেষ পাণ্ডিত্য লাভ করেন। জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়ির মেয়েরাও এই প্রথায় শিক্ষা লাভ করতো।

বেথুন সাহেব ১৮৪৮ সালে ভারতের আইন পরিষদের সদস্য এবং কাউন্সিল অফ এডুকেশনের সভাপতি হয়ে কলকাতায় আসেন এবং কাউন্সিল অফ এডুকেশনের সদস্য রামগোপাল ঘোষকে একটি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপনের পরিকল্পনা জানান রামগোপাল ঘোষ তার বন্ধু দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায় কে এই পরিকল্পনার কথা জানলে তিনি তার সিমলা স্ট্রীটের বৈঠকখানা বাড়িটি বিনা ভাড়ায় স্কুল প্রতিষ্ঠার জন্য দান করেন। এছাড়াও আধ বিঘা জমি এবং ১০০০ টাকাও দান করেন। ১৮৪৯ সালের ৭ই মে স্কুলটি ‘নেটিভ ফেমেল স্কুল’ নামে তার যাত্রা শুরু করে। ১৮৫০সালের ৬ই নভেম্বর হেদুয়ার পশ্চিম দিকের ভূমিতে বর্তমান “বেথুন স্কুল” এর ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন হয়। স্কুলের নতুন ভবনের কাজ সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই বেথুন্ সাহেব মারা যান। কিন্তু তিনি তার সমস্ত স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি স্কুলের নামে উইল করে রেখে যান। বেথুন সাহেব মারা যাবার পর এই স্কুলের ব্য্যভার সরকার গ্রহন করে। ১৮৫০-১৮৬৯ সাল পর্যন্ত এই স্কুলের সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন বিদ্যাসাগার মহাশয়। এছাড়াও এই স্কুলের অপর একজন শুভানুধ্যায়ী ছিলেন মদনমোহন তর্কালঙ্কার। এই বেথুন স্কুলেই প্রথম কলকাতার সম্ভ্রন্ত ঘরের মেয়েরা পড়তে আসত। তাদের মূলত গাড়ি করে নিয়ে আসা হত এবং পুনরায় গাড়ি করে বাড়ি ফিরিয়ে দিয়ে আসা হত।

এরপর থেকে ছেলেদের সাথে সমান পাল্লা দিয়ে মেয়েরাও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যাবস্থায় উন্নতি লাভ কতে থাকে। ১৮৫৭সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হওয়ার ২৩ বছর পর ১৮৭৮ সালে বেথুন স্কুল থেকে কাদম্বিনি বসু এবং সরলা বোস বিশ্ববিদ্যালায়ের প্রবেশিকা পরীক্ষায় বসার জন্য অনুমতি পায় এবং এই পরীক্ষায় কাদম্বিনি বসু পাস করেন এবং ১৮৭৯ সালে শুধুমাত্র তাকে নিয়েই বেথুন স্কুলের কলেজ বিভাগ খোলা হয়। এই সময় শুধুমাত্র হিন্দু মেয়রাই বেথুন কলেজ পড়ার সুযোগ পেত। এই সময় চন্দ্রমুখী বসু এই কলেজে পড়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন কিন্তু তিনি খ্রিষ্টান বলে এই কলেজে পড়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন। এরপর তিনি চার্চ নর্মাল স্কুলে এফ.এ পরা শুরু করেন। ১৮৮০ সালে মিস অ্যালেন ডি অ্যাব্রু নামে এক খ্রিষ্টান ছাত্রী বেথুন কলেজে পড়ার অধিকার পেলে চন্দ্রমুখী বসু বেথুন কলেজে যোগদান করেন এবং ১৮৮৩ সালে বি.এ এবং ১৮৮৪ সালে ইংরাজিতে অনার্স সহ এম.এ পরীক্ষাতে পাস করন। চন্দ্রমুখী বসু প্রথম বাঙালি মহিলা যিনি এম.এ পরীক্ষাতে পাস করেন। এরপর তিনি বেথুন কলেজেই শিক্ষিকা হিসাবে তার কর্মজীবন শুরু করেন এবং ১৮৮৬ সালে বেথুন কলেজ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিনে আসার পর চন্দ্রমুখী বসুকে এই কলেজের প্রধান শিক্ষিকা হিসাবে নিয়োগ করা হয়।
১৮৮৩ সালে কাদম্বিনি বসুর বিয়ে হয়ে যায়। বিয়ের পর তিনি মেডিকেল কলেজে ডাক্তারি পড়ার জন্য ভর্তি হন। এইসময় আরও ২জন বাঙালি ছাত্রী তার সাথে ডাক্তারি পড়া শুরু করন, তারা হলেন ভার্জিনিয়া মেরী বসু এবং বিধুমুখী বসু। ১৮৮৮সালে অনুষ্ঠিত প্রথম এম.বি (তৎকালীন এম.বি.বি.এস)পরীক্ষায় কাদম্বিনী বসু বাদে সকলেই পাস করেন। কিন্তু কাদম্বিনী বসুকে মহিলাদের স্পেশাল সার্টিফিকেট প্রদান করা হয়। এরপর কিছুদিন ডাক্তারি করার পর ১৮৯২ সালে তিনি বিলেত যাত্রা করেন। এবং কিছু বছরের মধ্যেই এল.আর.সি.পি(এডিনবরা), এল.আর.সি.এস(গ্লাসকো) এবং ডি. এফ.পি.এস(ডাবলিন) উপাধি নিয়ে দেশে ফিরে আসেন। কিছুদিন লেডি ডাফরিন হসপিটালে ডাক্তারি করেন তার পর নিজে স্বাধীন ভাবে ডাক্তারি শুরু করেন। ইনিই প্রথম বাঙালি এবং দ্বিতীয় ভারতীয় মহিলা ডাক্তার এবং ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম ভারতীয় নারী বক্তা

শুধুমাত্র কলকাতাতেই থেমে থাকেনি নারী শিক্ষার প্রসার। কলকাতার নিকটবর্তী অনেক স্থানেই অনেক মনিষী বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেছেন এবং কিছু স্কুল আজও সফলতার সাথে নারী শিক্ষাকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে। এর মধ্যে বারাসাত এর কালীকৃষ্ণ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় অন্যতম।১৮৪৭ সালে কালীকৃষ্ণ মিত্র নারী শিক্ষার প্রসারে এই স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৩৯ সালে সরকারি সাহায্যে বারাসাতে আরও একটি বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হয় যার বর্তমান নাম বারাসাত উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়, আজ ৮০বছর পরও এই স্কুল সুনামের সাথে শিক্ষার বিস্তার ঘটিয়ে চলেছে।

পরের পর্বে বলবো মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার কথা। একটু অপেক্ষা করুন প্লিজ।।

অজানা কলকাতা টুইটার (ojana Kolkata in twitterhttps://twitter.com/KolkataOjana?lang=en

অজানা কলকাতা ফেসবুক পেজঃ https://www.facebook.com/OJANA-Kolkata-351064638888700/?modal=admin_todo_tour

establishment  of schools in kolkata: for English education

১৮০০ খ্রিষ্টাব্দে শ্রীরামপুরের খ্রিস্টান মিশনারিরা প্রথম বিদ্যালয় স্থাপনের বাবস্থা করেন ঠিক এই বছরই কলকাতায় কম্পানির সিভিলিয়ানদের জন্য ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠা হয়। এই কলেজ কলকাতার প্রথম কলেজ কিন্তু ভারতের প্রথম পুর্নাঙ্গ কলেজ প্রতিষ্ঠা হয় ১৭৯২ সালে বেনারসে মূলত সংস্কৃত শিক্ষার জন্য। কিন্তু ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে বাংলা, আরবি, ফারসি, ইংরাজি, সংস্কৃত প্রভৃতি ও প্রাচ্যের ইতিহাস পড়ানোর জন্য দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পণ্ডিতদের সমবেত করাহয় এবং একই সাথে বিজ্ঞান শিক্ষার জন্যও উপযুক্ত বাবস্থা করা হয়। এরপর ১৮১৪ সালে মহারাজা জয়নারায়ন ঘোষাল নিজ বাসভবনে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর রামমোহন নাপিত, জগমোহন বসু, ভুবন দত্ত, কৃষ্ণ মোহন বসু প্রমুখ ব্যাক্তিবর্গ স্কুল প্রতিষ্ঠা করতে থাকেন। কিন্তু স্কুল গুলিতে ছিল বইয়ের অভাব। এই অভাব দূর করা এবং দেশবাসির জ্ঞান বিস্তারে সহায়তা করার জন্য ১৮১৭ সালে “কলকাতা স্কুল বুক সোসাইটি” এবং ১৮১৮সালে “কলকাতা স্কুল সোসাইটি” প্রতিষ্ঠা করাহয়। প্রথমেই তাদের উদেশ্য ছিল নতুন স্কুল প্রতিষ্ঠা এবং পাঠশালার আধুনিকীকরণ। সোসাইটি  খ্যাতনামা পণ্ডিত গৌরমোহন বিদ্যালঙ্কার মহাশয় কে সমস্ত পাঠশালার ছাত্র সংখ্যা, নাম , জাতি প্রভৃতি নথিভুক্তও করণের তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হয়।

১৮১৭ সালের ২০শে সেপ্টেম্বর হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠা করাহয়। মূল উদ্যোগী ছিলেন ডেভিড হেয়ার। হেয়ার শুধু কলেজ প্রতিষ্ঠা করেই থেমে থকেননি, কলেজ আশা সমস্ত মেধাবী ছত্রদের তিনি বাড়ি বাড়ি গিয়ে লেখাপরায় সাহায্য, অর্থ সাহায্য, এমনকি অসুস্থ ছাত্রদের নিজে হাতে সেবা করতেন। এছাড়া ছিল নিয়মিত উপস্থিতির জন্য পুরষ্কার। ১৮২৪ সালে তিনি একটি চিঠিতে উল্লেখ করেন যে “প্রথমে যেসব ছাত্ররা শিক্ষার আলো দেখবে তারই ভবিষ্যতে নতুন করে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেবে।”। তার এই কথা সত্যি হয়েছিল, অনেক ছাত্র হিন্দু কলেজ থেকে পাস করে তারাই আবার স্কুল প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী হয়।

১৮২১সালে ২১শে অগাস্ট ২৫০০০টাকা ব্যায়ে কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত হয় “গভঃ সংস্কৃত কলেজ”। এই কলেজ সংস্কৃত শিক্ষার সাথে ইংরাজি ও পাশ্চাত্য শিক্ষার ব্যাবস্থাও করা হয়। ১৮২৪ সালে ২৫শে ফেব্রুয়ারি গোলদীঘির উত্তরে এই কলেজ এর ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন হয়। এবং ১৮২৬ সালে ১মে কলেজ তার গোলদিঘির নবনির্মিত বাড়িতে চলে আসে এর আগে এই কলেজ এর পঠনপাঠন চলত ৬৬নং, বউবাজার স্ট্রীটে। কিন্তু এই কলেজে ব্রাহ্মন ও বৈদ্য সন্তান ও ১২ বছরের কম বয়সের কেউ ভর্তি হতে পারতোনা এবং টানা ১২ বছর অধ্যায়ন করতে হত। ১৮৫১-১৮৫৪ সালের মধ্যে বিদ্যাসাগার মহাশয়ের চেষ্টায় এই কলেজ এর দ্বার সবার জন্য উন্মুক্ত হয়।
১৮২৬ সালে ১মে হিন্দু কলেজ ও তার নতুন বাস ভাবনে উঠে আসে এবং তখনই হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও নামে এক অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান ইংরাজি ও ইতিহাস এর শিক্ষক হিসাবে যোগদান করেন। তিনি শিক্ষকতার সময়ে পাশ্চাত্য শিক্ষা ও ধারণা ছাত্রদের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়ে নবজাগরনের দীপ প্রজ্বলন করেন। তার অনুগামীরা পরিচিত হয় ইয়ং বেঙ্গল নামে। তার উনুগামী ৮ জন খ্যাতনামা ছাত্ররা হলেন কৃষ্ণমোহন বন্দোপাধ্যায়, রাসিককৃষ্ণ মল্লিক, রামগোপাল ঘোষ, রামতানু লাহিড়ী, রাধানাথ সিকদার, প্যারিচাদ মিত্র, শিবচন্দ্র দেব, ও দক্ষিণারাঞ্জন মুখোপাধ্যায়। এনারাই পরবর্তী কালে ভারতে প্রগতিমূলক আন্দোলনের সর্বেসর্বা হয়ে ওঠে।


১৮২১ সালে সংস্কৃত কলেজ প্রতিষ্ঠার সাথে সাথে কলকাতা স্কুল বুক সোসাইটির ইউরোপিয় সেক্রেটারি ডেভিড হেয়ার ও নেটিব সেক্রেটারি রাধাকান্ত দেব ৮ই জুন একটি রিপোর্ট পেশ করে, যা থেকে আমরা জানতে পারি যে কলকাতায় ছোট-বড় মিলিয়ে স্কুল ছিল মোট ২১১টি ও ছাত্র সংখ্যা ছিল ৪৯০০ জন। এই সকল ছাত্রদের পরীক্ষা হত শুভাবাজারের গোপীমোহন দেবের বাড়িতে। ভাল ফল করলে ছাত্র ও গরমশাই উভয়কেই পুরস্কৃত করা হত।
এইসময় থেকেই কলকাতার বিশেষ কিছু মহলে কথা উঠতে থাকে যে ইউরোপীয়দের দ্বারা গঠিত স্কুলে মিশনারিদের প্রভাব পড়ছে। এই বিষয় থেকে বাঙালিকে মুক্ত করার জন্য ১৮২৩ সালে ১১ই ডিসেম্বর রাজা রামমোহন রায় নিজ খরচে “অ্যাংলো হিন্দু স্কুল” স্থাপন করেন। ১৮২৯ সালে গৌরমোহন আঢ্য মিশনারি প্রভাব মুক্ত কিন্তু ইংরাজি শিক্ষার জন্য “ওরিয়েন্টাল সেমিনারি” একটি বিদ্যালায় স্থাপন করেন। এই স্কুলে সাংবাদিক গিরিশ চন্দ্র ঘোষ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, উমেশ চন্দ্র বন্দোপাধ্যায় প্রমুখ মনিষীরা শিক্ষা লাভ করেছেন। গৌরমোহন নিছু ক্লাসের জন্য ইংরেজ শিক্ষক, মাঝের ক্লাসের জন্য বাঙালি শিক্ষক ও উঁচু ক্লাসের জন্য ইংরেজ ও বাঙালি উভয় শিক্ষকই নিয়োগ করতেন। কারণ তার মূল উদেশ্য ছিল ইংরাজি শিক্ষার সাথে সাথে দেশীয় ভাষা শিক্ষাতেও জোর দাওয়া।


বিনা মুল্যে ইংরাজি শিক্ষার জন্য “হিন্দু ফ্রি স্কুল” স্থাপিত হয় ও ১৮৩৩ সালে মতিলাল শীল “শীল’স ফ্রি কলেজ” স্থাপন করেন। প্রথমে এই কলেজ সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের অধিনে ছিল কিন্তু মতিলালার সাথে মতবিরোধ হওয়াতে ১৮৪৬সালে তিনি এই কলেজের পরিচলন ভার নিজে গ্রহন করেন এবং ইহুদি শিক্ষক নিয়োগ করে ধর্ম নিরপেক্ষ শিক্ষার ব্যাবস্থা করেন। ১৮৫৩ সালে “হিন্দু মেট্রোপলিটান কলেজ” স্থাপনেও মতিলাল শীল অর্থ সাহায্য করেন।

১৮৩৫ সালে ইংরেজ সরকার ইংরাজি শিক্ষার আনুকুল্যের নীতি গ্রহন করার পর সরকারি সাহায্যে স্কুল ও কলেজ স্থাপন হতে থাকে। ও প্রতিষ্ঠিত স্কুল ও কলেজ গুলিতে অর্থ সাহায্যের বাবস্থা করা হয়।
১৮৩৯ সালে প্রথম হিন্দু কলেজের পাঠশালা বিভাগ খোলা হয় ও সংস্কৃত কলেজের সংলগ্ল স্থানে নতুন ভবন তৈরি করা হয়। এই স্কুলে ১২ বছরের অধিক কোন ছাত্র ভর্তি হতে পারতনা। প্রথম বর্গের ছত্রদের বার্ষিক বেতন ছিল ২ টাকা, দ্বিতীয় বর্গের ৪ টাকা ও তৃতীয় বর্গের ছিল ৮ টাকা। পাঠ্য পুস্তক বিনামুল্যে স্কুল থেকে দেওয়া হত।

১৮৪০ সালে স্কুল সোসাইটির দুজন গুরুত্ব পূর্ণ সদস্য ব্যারেটো এন্ড কোম্পানি এবং ম্যাকিনটশ এন্ড কোম্পানির বিপর্যয়ের ফলে পটলডাঙ্গা ইংরাজি স্কুল এবং আরপুলির বাংলা স্কুল বাদে প্রায় সব স্কুল উঠে যায়। এই দুটি স্কুল হেয়ার নিজের অধিনে নিয়ে পরিচালনা করতে থাকলেন। বারতমানে এই দুটি স্কুল মিলিত হয়ে বর্তমানে হেয়ার স্কুলের উদ্ভব হয়েছে।

১৮৫০এর দশকে তৎকালীন বিখ্যাত বাইজী হিরাবুলবুলের পুত্র বেশ্যানন্দন, যবন এবং খ্রিস্টান বালকগন হিন্দু কলেজে ভর্তি হলে কলকাতার ধনী হিন্দুগন ঐ কলেজ থকে তাদের নিজেদের ছেলেদের ছাড়িয়ে নিয়ে আসেন এবং হিন্দু মেট্রোপলিটান কলেজ তৈরির সিদ্ধান্ত নেন। এই কলেজ তৈরির জন্য মতিলাল শীল এবং রানী রাসমণি(১০০০০ টাকা) অর্থ সাহায্য করেন। ২মে ১৮৫৩ সালে রামগোপাল মল্লিকের বাড়িতে এই কলেজের পঠনপাঠন শুরু হয়। পরবর্তীকালে মতিলাল শীলের কলেজ ও গুরুচরন দত্তের ডেভিড হেয়ার একাডেমী এই কলেজের সাথে সংযুক্ত হয়। শীল’স ফ্রি কলেজ ১৮৫৮ সালে পুনরায় হিন্দু মেট্রোপলিটান কলেজ থেকে বিমুক্ত হয়।


১৮৫৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালায় স্থাপনের পর  দেশের তথা কলকাতার শিক্ষা ব্যাবস্থা দ্রুত উন্নতি লাভ করতে থাকে। ১৮৫৪ সালে হিন্দু কলজের নাম পাল্টে হয় প্রেসিডেন্সি কলেজ। ১৮৫৮ সালে বিশ্ববিদ্যালয় কতৃক প্রথম বি.এ পরীক্ষা প্রবর্তিত হয় ও এই পরীক্ষায় পাস করেন মাত্র ২জন। বাঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও যদুনাথ বসু।
শুধুমাত্র কলকাতাতেই শিক্ষা বিস্তারের জন্য স্কুল প্রতিষ্ঠা হয়নি কলকাতার আশেপাশে অনেক স্কুল স্থাপন হয়েছে যার মধ্যে অনেক স্কুল সুনামের সাথে আজও শিক্ষার প্রসার করে চলেছে। যার মধ্যে বারাসাত পি.সি.এস সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় অন্যতম। ১৮৪৬ সালে প্যারিচরন সরকার এবং বিদ্যাসাগার মহাশয়ের প্রচেষ্টায় পরিত্যক্ত জেলখানয় এই স্কুলের সূত্রপাত। আজও সফলতার সাথে এই স্কুল শিক্ষার আলো প্রচার করে চলেছে। আমি নিজেও এই স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র।

কলকাতার শিক্ষা বাবস্থার উন্নতিকল্পে অনুদান তথ্যঃ
জেনারেল ক্লড মার্টিন বিনামুল্যে শিক্ষা প্রদান এবং বিদ্যালায় স্থাপনের জন্য ৩৩লক্ষ টাকা দান করেন। এই দান থেকেই লা-মার্টিনিয়ের কলেজ স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়(১৮৩৩-৩৫)।

১৮২৫ সালে কালীশঙ্কর ঘোষাল ‘শিক্ষার উপকারার্থে’ ২০০০০ টাকা দান করেন।

১৮২৬ সালে গুরুপ্রসাদ বসু ১০০০০ টাকা দান করেন।

রাজা শিবচন্দ্র রায় ও রাজা নৃসিংহ চন্দ্র রায় ‘বিদ্যাসম্পরর্কীয় উপকারার্থে’ ১লক্ষ৪হাজার টাকা দান করেন।

 কিন্তু এই ব্লগে ইতিহাস বলতে বলতে তো শুধু ছাত্রদের কথাই বলে গেলাম কিন্তু কলকাতাতে নারী শিক্ষার প্রসারও হয়েছিল সমান ভাবে। একটু অপেক্ষা করুন বলবো সেই কথা পরের ব্লগে। 


স্কুল প্রতিষ্ঠার আদিপর্বঃ কলকাতায় এসে যারা বসবাস শুরু করেছিলেন তারা সকলেই কোন না কোন গ্রাম থেকে এসেছিল। গ্রাম থেকে যেমন সাধারন কুমোর, কামাররা এসেছিলো তেমনি এসেছিলেন বামুন-পুরুত, নাপিত, জ্ঞানী ব্যক্তি সকলেই। শহর কলকাতায় আসার সময় শুধু তারা নিজেরা আসেননি সাথে এনেছিলেন দেশের সনাতন শিক্ষা ব্যাবস্থা। সনাতন শিক্ষা ব্যাবস্থায় হিন্দু ধর্মের মধ্যে ছিল চতুষ্পাঠী বা টোল এবং পাঠশালা। মূলত ব্রাহ্মণদের দ্বারা মূলত টোল বা চতুষ্পাঠী শিক্ষাদান করা হত। পাঠশালায় যেকোনো জাতির লোকেরা শিক্ষাদান করতে পারত তাদের বলাহত গুরুমশাই। এইসব পাঠশালায় ছেলে মেয় সকলেই পড়তে পারত। ১৮৮৬ সালে প্রকাশিত রাসসুন্দরির “আমার জীবন” গ্রন্থে এই পাঠশালায় মেয়েদের পড়ার উল্লেখ আছে। মজার কথা হল পাঠশালাতে শিক্ষা বাবস্থা চলত বেশ কড়া শাসনে এবং পড়ার গাফিলতিতে শাস্তি দানের প্রচলন বিশেষ ভাবে ছিল যা বর্ননা আমরা উনবিংশ শতকের প্রায় সব বাংলা উপন্যাসেই দেখতে পাই।

এইসকল পাঠশালায় মূলত প্রাথমিক লেখাপড়া, সংস্কৃত ও বাংলা ভাষার শিক্ষা ও ধর্মীয় শিক্ষা প্রদান করাহত। বিংশ শতাব্দীর শেষ অবধি এইসকল পাঠশালা কলকাতার আশেপাশের গ্রামে টিকেছিল কিন্তু তা বর্তমানে সরকারি সাহায্যে প্রথমিক বিদ্যালয় এর রূপ ধারন করেছে।

হিন্দু ধর্মের মতো ইসলাম ধর্মেও সনাতন শিক্ষা ব্যাবস্থার উল্লেখ আছে। এই ধর্মে মুসলমান পণ্ডিত বা মৌলবিদের দ্বারা বিদ্যা চর্চা চলত। এই সকল প্রতিষ্ঠান কে বলাহত মাদ্রাসা।

কলকাতায় প্রথম মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠাঃ ১৭৮০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে কলকাতার শিক্ষিত পদস্ত মুসলমানরা হেস্টিংসের কাছে কলকাতাতে একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার দাবি জানান যাতে মুসলমান ছেলেমেয়রা ইসলাম আইন শিখে সরকারের কাজে সাহায্য করতে পারে। এবং তারা মুসলমান পণ্ডিত মজিদউদ্দিনকে সেই মাদ্রাসার প্রধান করার কথাও বলেন। তখনও ভারতে মুঘল শাসনের পূর্ণ অবসান ঘটেনি ফলে ইসলাম আইন জানা লোকের বিশেষ প্রয়োজন সর্বোপরি শিক্ষা অনুরাগী হেস্টিংস মাদ্রাসা গঠনের দাবি মেনে নিলেন। বর্তমান বৈঠকখানা বাজারের নিকট পদ্মপুকুরে ৫৬৪১ টাকা খরচ করে একটি জমি কিনে মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করলেন। এবং মাসে ৬২৫ টাকা খরচ করে মাদ্রাসা চালাতে লাগলেন। ১৭৮০ সালের সেপ্টেম্বর থেকে পরের বছরের এপ্রিল অবধি হেস্টিংস নিজের খরছে মাদ্রাসা চালালেন। ১৭৮১ সালের এপ্রিলে হেস্টিংস কোম্পানির কাছে মাদ্রাসার স্থায়ী ভবন নির্মাণের জন্য অনুদান চান। কোম্পানি মাদ্রাসা গঠনকে সমীচীন মনে করে কোম্পানি এতদিনের মাদ্রাসার খরচ বাবদ ১৫২৫১ টাকা ও জমি কেনা বাবদ ৫৬৪১ টাকা হেস্টিংসকে মিটিয়ে দেয় ও মাদ্রাসার জন্য যাবতীয় খরচ কোম্পানির তহবিল থেকে করার অনুমিতি দেয়।

মাদ্রাসাটি প্রথম যে স্থানে স্থাপন করা হয় সেটি অস্বাস্থ্য কর বলে বিবেচিত হয় তাই ১৮২৩ সালের জুন মাসে মাদ্রাসার নতুন ভাবন তৈরির পরিকল্পনা গ্রহন করা হয়। ১৮২৪ সালের ১৫ই জুলাই নতুন মাদ্রাসার ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করা হয় মুসলিম অধ্যুষিত কলিঙ্গাতে (বর্তমান ওয়েলেসলী স্ট্রীটে)। ১৮২৭ খ্রিষ্টাব্দ এর অগাস্ট থেকে এখনে নিয়মিত ভাবে পঠনপাঠন শুরু হয়। মাদ্রাসার নতুন ভবন তৈরির জন্য সরকার ব্যায় করে ১,৪০,৫৩৭ টাকা। এই প্রতিষ্ঠানের বর্তমান নাম “ক্যালকাটা মাদ্রাসা”

কলকাতাতে মাদ্রাসা, পাঠশালা, চতুষ্পাঠী তো অনেক ছিল, কিন্তু এতে তো শুধু সনাতনী ও ধর্মীও শিক্ষালাভই সম্ভব ছিল। কিন্তু কলকাতা বাসীকে তো ইংরাজি শেখাতে হবে। উনবিংশ শতকের শুরুতেই ইংরাজি শিক্ষার জন্য স্কুল কলেজ স্থাপন করা হয়েছিল। জানতে চান সেই ইতিহাস? অপেক্ষা করুন পরের ব্লগেই বলব সেই ইতিহাস।




অজানা কলকাতা টুইটার (ojana Kolkata in twitterhttps://twitter.com/KolkataOjana?lang=en

অজানা কলকাতা ফেসবুক পেজঃ https://www.facebook.com/OJANA-Kolkata-351064638888700/?modal=admin_todo_tour



শিক্ষার প্রসারে বই যেমন একটি মাধ্যম ছিল তেমনি ছাপাখানাও শিক্ষাকে বিশেষ প্রভাবিত করেছিল। ছাপাখনার বহুলতার আগে বাংলা তথা ভারতের শিক্ষা ব্যাবস্থার মূল উপকরন বই ছিল হাতে লেখা। যার ফলে শিক্ষা একটি ছোট গণ্ডির মধ্যে আবধ্য ছিল, ছাপাখানা এই গণ্ডি ভেঙ্গে শিক্ষাকে সার্বজনীন করে তোলে।কিন্তু এখানে বাধ সাধল কিছু সনাতনি মানুষ কারণ শিক্ষা সার্বজনীন হলে শিক্ষিত বলে যে দম্ভ সেটা তাদের আর থাকবে না। তারা প্রচার করতে লাগলেন যে বিদেশিদের ছাপানো বই অস্পৃশ্য এবং তার দিকে তাকানও পাপ, তাদের আরও বক্তব্য যে এই ছাপানো বই হিন্দু ধর্মকে নষ্ট করার একটি যন্ত্র মাত্র।

কিন্তু ছাপানো বই জনসমাজের ওপর এতটাই প্রভাব ফেলে যে সনাতনীদের প্রচার করা বানী অচিরেই বিলিন হয়ে গেল। মজার কথা হল যে ছাপানো বই কিনে জনসাধারণের পড়ার স্রোতে সনাতনীরাও সহজেই ভেসে গিয়েছিল। সত্যি বলতে ছাপা বইয়ের প্রচলন না হলে কলকাতার শিক্ষা ব্যাবস্থার প্রসার এত সুগম হত না।

১৭৭৮ সালে কলকাতা ও হুগলীতে ছাপাখান বিদ্যমান ছিল কিন্তু তাতে প্রকাশিত হত কোম্পানির প্রয়োজনীয় দলিলপত্র আর যা বই ছাপা হত তা মূলত ফিরিঙ্গীদের উপকারের জন্য, সর্বসাধারণের জন্য ছাপাখনা তখন ছিলনা। উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমে সর্বসাধারণের জন্য ছাপাখানা তৈরি হয় এবং ক্রমে কলকাতা মুদ্রনের পীঠস্থান হয়ে ওঠে।

উনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে ছাপাখানা প্রতিষ্ঠায় প্রধান ভূমিকা পালন করে শ্রীরামপুরের মিশনারিরা। তারা প্রথমে ছেপে প্রকাশ করতে থাকে দেশের জনপ্রিয় বই যেগুলো মূলত হাতে লেখা পুঁথির মাধ্যমে পড়ান হত। যেমন কৃত্তিবাসের রামায়ন, কাশীরাম দাসের মহাভারত, ভারতচন্দ্রের বিদ্যাসুন্দর প্রভৃতি বই ছেপে বেড়তে লাগল শ্রীরামপুর থেকে। শ্রীরামপুর থেকে রামরাম বসু প্রকাশ করলেন তার রাজা প্রতাপদ্যিত্য চরিত্র ও রাজীবলোচন মুখোপাধ্যায় প্রকাশ করলেন কৃষ্ণচন্দ্র রায়স্য চরিত্রং। এছাড়া নিয়মিত প্রকাশিত হত শ্রীরামপুর স্কুলের পাঠ্যপুস্তক।

কিন্তু কলকাতাতে ১৮১৭ সালে স্কুল বুক সোসাইটি প্রতিষ্ঠা হবার পর এই সোসাইটি বই ছাপানয় বিশেষ ভূমিকা নিল ফলে শ্রীরামপুরের ভূমিকা কিছুটা ফিকে হয়ে আসে। এই প্রতিষ্ঠানের মূল উদেশ্য ছিল দেশের ধনী থেকে গরিব সবার মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়া। ফলে একের পর এক প্রকাশিত হতে লাগল বিভিন্ন সহজ বোধ্য ও উপযোগী পাঠ্যপুস্তক । রাজা রামমোহন রায় লিখলেন বাংলা ব্যাকরণ, রাজা রাধাকান্ত দেব লিখেন ১২৮ পাতার একটি বই যাতে বর্ণমালা থকে ইতিহাস অবধি সব বিষয়ের সম্মক ধারণা ছিল। এছাড়া স্কুল বুক সোসাইটির উদ্যোগে রাধাকান্ত দেব, তরিনী চরণ মিত্র ও নীলকমল সেন যুক্ত ভাবে একটি বই লিখলেন যার নাম ‘নীতিসার’।

এরপর পাঠ্যপুস্তক রচনা এবং মুদ্রণে বিপ্লব আনলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও মদনমোহন তর্কালঙ্কার। ১৮৪৬ খ্রিষ্টাব্দে এরা যুক্ত ভাবে স্থাপন করলেন একটি ছাপাখানা। এই ছাপাখানা থেকে বিদ্যাসাগর প্রকাশ করলেন বর্ণপরিচয়, কথামালা, বোধোদয়, আখ্যামনঞ্জরি, সংস্কৃত ব্যাকরণের উপক্রমণিকা, ব্যাকরণ কৌমুদি প্রভৃতি বই। এবং মদনমোহন তর্কালঙ্কার প্রকাশ করলেন তিন খণ্ডের “শিশুশিক্ষা”।

এরপর প্রকাশ পেল প্রথম মহিলা দ্বারা রচিত সাহিত্য। ১৮৫৬সালে কৃষ্ণকামিনী দাসী প্রকাশ করলেন ‘চিত্তবিলাসিনী’ কাব্যগ্রন্থ। ১৮৬৭সালে রাসসুন্দরী দেবী প্রকাশ করলেন ‘আমার জীবন’। এই দুটিই প্রথম মহিলা দ্বারা রচিত ও প্রকাশিত প্রথম বই।

বটতলার প্রকাশনাঃ বর্তমান নিমু গোস্বামী লেন ও আহিরীটোলার সংযোগ স্থলে ছিল একটি বটগাছ। ১৮২০ সালে এই বটগাছের নিচেই বিশ্বনাথ দেবের হাত ধরে বটতলা সাহিত্য এবং প্রকাশনের জন্ম। এই প্রকাশনের মূল উদেশ্য ছিল গ্রামের প্রতিটি কোনায় পৌঁছে দিতে হবে বইকে। এইধারনা নিয়ে এই বটগাছের নিচে শুরু হয় সস্তায় বই ছাপিয়ে কম দামে ফেরিওয়ালা মারফত গ্রামে গ্রামে বিক্রি। 

বিশ্বনাথ দেবের পর বানেশ্বর ঘোষ এই বটতলার প্রকাশনের ধারনাকে জনপ্রিয় করে তোলেন।বানেশর ঘোষ বর্ধমান জেলার চলবলপুর গ্রাম থকে এসে কলকাতাতে একটি মুদির দোকান খোলেন। কিন্তু তার মনে ছিল যে কম দামে সকলের কাছে বই পৌঁছে দিতে হবে, এই আশা নিয়ে খোলেন “সুলভ পুস্তকালয়” এবং প্রকাশ করতে থাকেন বাজার চলতি বইয়ের সস্তা সংস্করণ এবং ফেরিওয়ালা মারফত গ্রামের ও শহরের গরিব পাঠকদের কাছে পৌঁছে দিতে থাকেন। বিদ্যাসাগর মহাশয়ের অনুমতিক্রমে তিনি প্রকাশ করলেন সস্তার বর্ণপরিচয়এর পর থেকে প্রকাশ করতে থাকেন রামায়ণ, মহাভারত ও নানা শাস্ত্র গ্রন্থ। এই ‘সুলভ পুস্তালয়’ আজও বেঁচে আছে কিন্তু নাম পরিবর্তন হয়েছে। বর্তমান নাম ‘আনান্দ এজেন্সি’।

আশাকরি বোঝা গেলো বটতলার সাহিত্য এর ধারনার উদ্ভব কি করে? তার আজ থকে বটতলার সাহিত্য নিয়ে মুখরোচক আলোচনা করার আগে ভেবে দেখবেন নিজের ঐতিহ্য কে কতটা কলুষিত করছেন।

বই ছেপে প্রকাশিত হওয়ার প্রায় ৫০-৬০ বছরের মধ্যে লোক ছাপা বইয়ের মাধ্যমে পরতে ও লিখতে শিখল এবং আসতে আসতে ছাপা বই হয়ে উঠল লোকের নিত্য দিনের সঙ্গী। এর পরের যুগের সাহিত্য, নাটক, ইতিহাস, দর্শন, সংবাদপত্র সবই কলকাতার দান। ও ক্রমাগত কলকাতা হয়ে উঠল জ্ঞানকাণ্ডের পীঠস্থান। আজ একটু ফিকে হলেও কলকাতা সেই ভূমিকা আজও অটুট রেখেছে। 

বই ও তার প্রকাশ তো অনেক হল কিন্তু এই বইত পরতে হবে তার জন্য চাই স্কুল। হ্যাঁ স্কুল, কলেজ মাদ্রাসা সবই তৈরি হয়েছিল কলকাতায়। 

সেই ইতিহাস জানতে হলে অপেক্ষা করতে হবে পরের ব্লগের জন্য। 


অজানা কলকাতা টুইটার (ojana Kolkata in twitterhttps://twitter.com/KolkataOjana?lang=en

অজানা কলকাতা ফেসবুক পেজঃ https://www.facebook.com/OJANA-Kolkata-351064638888700/?modal=admin_todo_tour




সময়টা লর্ড ওয়ারেন হেস্টিংসের, এইসময় থেকেই ভারতে ব্রিটিশদের খুঁটি সুদৃঢ় হতে থাকে।
হেস্টিংস ছিলেন একজন বিদ্যা অনুরাগী ব্যক্তি। ভারতে আসার পর প্রাচ্য শিক্ষার বিষয়ে বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করেন। ১৭৭৪ সালে তারই তত্ত্বাবধানে তৈরি হল কলকাতা সুপ্রিম কোর্ট। ইংরেজ সাহেবরা তো কাজ পেলেনই সেই সাথে কাজ পেলেন অনেক বাঙালি সাধারন জনগন। কিন্তু গোল বাঁধল তো তখনই যখন সাহেব আর বাঙ্গালীদের মধ্যে ভাষা বোঝার সমস্যা দেখা দিল। কারন সাহেবরা জানেনা বাংলা আর ভারতে তখন ব্যাপক ভাবে ইংরাজি শিক্ষা শুরু হয়নি তাই ইংরাজি জানার প্রশ্নও আসেনা। কিন্তু কাজ চালাতে গেলে তো উভয়কেই বাংলা ও ইংরাজি দুটো ভাষাই জানতে হবে। ১৭৭৮ সালে এই সমস্যার আংশিক সমাধান করলেন নাথানিয়াল ব্রাশী হ্যালহেড নামে একজন ব্রিটিশ নাগরিক। ইংরাজরা যাতে বাংলা ভাষা সহজে শিখতে পারে তাই তিনি রচনা করলেন ‘ ইংরাজিতে বাংলা ভাষার ব্যাকরণ’ এবং বাংলা ভাষা যাতে এদেশের সাহেবরা পড়ে বুঝতে পারেন ও বাংলা ছাপার জন্য চার্লস উইলসনকে দিয়ে তৈরি করালেন বাংলা ছাপার অক্ষর। ও প্রাচ্য সাহিত্যকে ব্রিটিশদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য চার্লস উইলসনকে দিয়ে ‘শ্রীমদ্ভাগবদগীতা’-এর ইংরাজি অনুবাদ করান।
এরপর হেস্টিংসের মূল উদেশ্য হয়ে উঠল বাঙালিকে ইংরাজি শেখান যাতে তারা সাহেবদের সাথে সমান মর্যাদায় কাজ করতে পারেন। কিন্তু কোন আশানরুপ উপায় না দেখে তিনি বিজ্ঞাপন দিলেন “ ইংরাজি ভাষার এমন এক শব্দকোষ প্রকাশ করতে হবে যাতে এদেশের লোকেরা সহজে ইংরাজি শিক্ষা লাভ করতে পারে। আর এইকাজ যে করতে পারবে তাকে পুরস্কৃত করা হবে।” এই বিজ্ঞাপন বুঝতে পেরে বাঙালিদের মধ্যে ইংরাজি শিক্ষার প্রবল আকাঙ্ক্ষা জন্ম নেয়। কিন্তু এই স্বপ্ন হেস্টিংস তার জামানায় পূর্ণ করতে পারেননি। অবশেষে ১৭৯৩ সালে প্রকাশিত হয় স্যার অ্যারন আপজনের “ইংরাজি ও বাংলা ভোকাভুলারি” ১৭৯৭ সালে প্রকাশিত হয় জন মিলারের “শিক্ষাগুরু” ও ১৭৯৯ সালে হেনরি পিটস ফরস্টারের “ভোকাবুলারি”। এই তিন বই খুব উপযোগী হলেও ফরস্টারের বইটিই সবথেকে বেশি আকর্ষণীয় হয় বাঙালিদের কাছে। এইসকল বইপড়ে বাঙালি শব্দ চয়ন করে ইংরাজি বলতে বা লিখতে পারত কিন্তু ইংরাজি ব্যাকরণের ব্যাবহার তারা জানত না।
কিন্তু এত প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনজন বাঙালি কিন্তু অসাধারন ইংরাজি শিখে সাহেবদের মন জয় করেছিলেন। তারা হলেন আইনজীবী রামনারায়ন মিশ্র এবং আনান্দরাম ও হেডক্লার্ক রামমোহন মজুমদার। হিকি তার ‘স্মৃতিকথা’-তে রামমোহন মজুমদারের নাম উল্লেখ করেছেন।
বাঙালি ইংরাজি ব্যাকরণ শিখেছিল পাশ্চাত্য বাবস্থায় স্কুল স্থাপনের পর। বলবো সেই ইতিহাস “কলকাতাতে স্কুলের বিকাশ” এই ব্লগে।

প্রথম বাংলা বই:  
বাংলার প্রথম ছাপা খবরের কাগজ হল “সমাচার দর্পণ” প্রকাশিত হত শ্রীরামপুর থেকে, এবং প্রকাশ করতেন উইলিয়াম কেরি ও উইলিয়াম ওয়ার্ড। শ্রীরামপুরের মাহেশ থেকেই কলকাতাতে চলে আসেন বাংলা বইয়ের পথিকৃৎ নগেন্দ্রানাথ বসু এর পূর্বপুরুষরা। থাকতে শুরু করেন শ্যামবাজারে। শ্যামবাজার পাঁচ মাথার মোড় থেকে ভুপেন বোস অ্যাভিনিউ ধরে মিত্র ক্যাফের এলেন এবার মিত্র ক্যাফের উল্টো দিকে দেখতে পাবেন বৃন্দাবন পাল লেন, এই রাস্তায় ঢুকে আপনি সোজা এগিয়ে গেলে বামদিকে প্রথম যে রাস্তাটা পরবে সেটার বর্তমান নাম বিশ্বকোষ লেন। কিন্তু এই রাস্তার আগের নাম ছিল কাঁটাপুকুর বাই লেন। এখানেই থাকতেন নগেন্দ্রানাথ বসু। জন্মঃ ৬জুলাই ১৮৬৬ সালে। মেধাবী নগেন্দ্রানাথ বসু ১৫-১৬ বছর বয়সেই যুক্ত হন সাহিত্যচর্চার সাথে এবং দুটি মাসিক পত্রিকা সম্পাদনার সাথে যুক্ত ছিলেন। মাত্র ১৮ বছর বয়সে শব্দেন্দু মহাকোষ নামে ইংরাজি থেকে বাংলা অভিধানের সম্পাদনার দায়িত্ব গ্রহন করেন। কিন্তু সবথেকে অবিস্মরণীয় কৃতিত্ব হল বাংলা বিশ্বকোষ এর সম্পাদনা যা প্রথম বাঙ্গালা encyclopediaএই বাংলা বিশ্বকোষ এর কাজ শুরু করেন রঙ্গলাল ও ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়। প্রথম খণ্ড প্রকাশিত হয় ১৮৮৫ সালে। ১৮৮৮ সালে নগেন্দ্রানাথ বসু ২২বছর বয়সে এই বিশ্বকোষের কাজ শুরু করেন। এরপর ২২ বছর খেটে প্রকাশ করেন বাংলা বিশ্বকোষের ২২টি খণ্ড। কাজ শেষ হয় আপ্রিল,১৯১১ সালে১৯৩৩সালে নগেন্দ্রানাথ বসু বাংলা বিশ্বকোষের সংস্করণের কাজ শুরু করেন কিন্তু ১৯৩৮ সালে তার মৃত্যুর জন্য দ্বিতীয় সংস্করণ ৪টি খণ্ডের পর থেমে যায়।  
১৭ই মার্চ ১৯১৫ সালে একজন বাঙালির অসামান্য কাজকে সম্মান জানাতে কাঁটাপুকুর বাই লেনের নাম কলকাতা মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন করে দেয় বিশ্বকোষ লেন। সেই নাম আজও অপরিবর্তিত এবং এইখানে এখনও থাকেন নগেন্দ্রানাথ বসুর নাতি শম্ভুনাথ বসু ও তার পরিবার। 
বইয়ের নামে রাস্তার নামকরনের প্রথম উদাহরণ কলকাতার এই “বিশ্বকোষ লেন”
কলকাতাতে আরও একটি রাস্তার নাম বইয়ের নামে, হাজরা ল্যান্সডাউন ক্রসিঙের কাছে আছে “স্বর্ণলতা লেন” যার নামকরন হয় তারকনাথ গাঙ্গুলির উপন্যাস স্বর্ণলতা থেকে।  যে শহরে বিশ্বের সবথেকে বড় ওপেন এয়ার বইমেলা হয় আমাদের শহরে আর এশিয়ার বৃহত্তম ওপেন এয়ার বুক মার্কেট আমাদের শহরে। এখানে যদি বইয়ের নামে রাস্তা না হয় তো কথায় হবে?  
বইয়ের কথাত অনেক হল কিন্তু বই তো ছাপাতে হবে নাহলে লোকের হাতে হাতে যাবে কিকরে? সে বাবস্থাও হয়েছিল উনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে আর সেই কাজে বিশেষ ভুমিকা নিয়েছিল শ্রীরামপুর ত্রয়ী। বলবো সেকথা পরের পর্বে। 


অজানা কলকাতা টুইটার (ojana Kolkata in twitter) https://twitter.com/KolkataOjana?lang=en

অজানা কলকাতা ফেসবুক পেজঃ https://www.facebook.com/OJANA-Kolkata-351064638888700/?modal=admin_todo_tour